আবরার হত্যায় ফেসবুকে নিন্দার ঝড়

প্রকাশিতঃ ৩:৩৫ অপরাহ্ণ, বুধ, ৯ অক্টোবর ১৯

নিউজ ডেস্ক: বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় বইছে। আবার অনেকে প্রশ্ন তুলছেন দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে আবরারের মত মেধাবীকে জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়েছে। তাহলে আমারা স্বধীন দেশে নিরাপদ আছি? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশানসন রাজনীতির হাতে বন্ধী কেন? অভিবাবকরা বলছেন কোন ভরসায় সন্তানদের উচ্ছ শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠাবো? নির্জাতনের কথা উল্লেখ বুয়েটের এক শিক্ষার্থী স্টাটাচ ও দিয়েছেন।

গত রবিবার রাতে আবরার হত্যার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে এমন নিন্দার ঝড় চলছে।
বুয়েটের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক স্টাটাস হুবহু তুলে ধরা হলো।
এগুলো আমারই ছবি, ছয় বছর আগের, আবরার মারা গেছে, আমি ওই দফায় বেঁচে ফিরেছি।

বুয়েটের ও এ বি এর দোতলায় মেকানিক্যাল ড্রয়িং কুইজ দেয়া শেষ হওয়া মাত্রই পরীক্ষার রুম থেকে তন্ময়, আরাফাত, শুভ্র জ্যোতি টিকাদারদের নেতৃত্বে ৮-১০ জন ছাত্রলীগের ছেলে শিক্ষকের সামনে থেকে তুলে নিয়ে আহসানউল্লাহ হলের তখনকার টর্চার সেল ৩১৯ নাম্বার রুমে নির্যাতন করে। আমি কারো সঙ্গে যেখানে রাগারাগি পর্যন্ত করতাম না, কারো সঙ্গে কখনোই সম্পর্ক খারাপ পর্যন্ত যেখানে ছিল না, শুধুমাত্র ফেইসবুকে সরকারি নীতির সমালোচনা করে পোস্টের কারণে বুয়েটের মত একটা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগ আমার সঙ্গে এমন আচরণ করে।

এর ৬ দিন আগে সাবেক বুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদার(‘০৯) ও কাজল(‘০৯) ল্যাব থেকে আমাকে ধরতে এসে ব্যর্থ হয়ে পরীক্ষার রুম থেকে আমাকে একা ধরতে ওরা ৮-১০ জন প্রস্তুতি নিয়ে আসে! বিকেল ৫ টা থেকে রাত ১১ টা ৩০!! বদ্ধ রুমে আমার পিঠের ওপর লোহা দিয়ে ‘১০ ব্যাচের এক ভাই প্রধানত তার শক্তি পরীক্ষা করে। এর কতদিন আগে কোনো একটা নামাজ মিস দিয়েছি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন তারা আসর আর মাগরিব নামাজ পর্যন্ত পড়ার সুযোগ দেয়নি।

সারাজীবন একটি মাত্র স্বপ্ন দেখেছিলাম- বুয়েটে পড়বো। বুয়েটের ছাত্রদের ভাবতাম আদর্শ। অথচ সেখানেও এমন হবে- জানা ছিল না। ভর্তি পরীক্ষার সময় গুরুজনেরা বলতেন- দোয়া কর, যেখানে তোমার জন্য কল্যাণ, আল্লাহ যেন সেখানেই তোমাকে চান্স পাইয়ে দেন। আর বুয়েটের অন্ধপ্রেমিক এই আমি দোয়া করতাম- আল্লাহ, বুয়েটেই আমার কল্যাণ দাও।

আসলে বুয়েটে পড়ার প্রথম ইচ্ছে হয়েছিল ক্লাস ফাইভে, বাবা বলেছিলেন- ছেলেকে বুয়েটে পড়াতে চাই, সেই থেকে। ভার্সিটি এডমিশনের সময় বাবা অন্য ভার্সিটিগুলোর ফর্ম নিতে দিচ্ছিলেন না, বলছিলেন- ওসবে কালো রাজনীতি ছেয়ে গেছে, বুয়েটেই চান্স পেতে হবে, ওখানেই পড়তে হবে, ওখানে কালো রাজনীতি নেই। জানি, তুমি পারবা।

পরবর্তীতে আমার বাবা আমার ওপর নির্যাতন দেখে ডুকরে কেঁদেছেন। আমি হাসিমুখে বলেছি- সব ঠিক হবে, আল্লাহ ভরসা, কোনো অন্যায় করিনি, আমার আল্লাহ সাক্ষী, আল্লাহই এর প্রতিদান দেবেন। মায়ের কান্নাজড়িত চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার ছিল না, মনে মনে ভেবেছি- “আর কেহ না জানুক, তুমি তো জানো মা, তোমার ছেলে কেমন” এত নির্যাতনের পর আবার আমাকেই উলটো পুলিশে দেয়ার জন্য পুলিশ ডেকে আনে। কিছু শিক্ষক অনেক চেষ্টা করে আর অনেক অপমান সহ্য করেও তা থেকে বাঁচিয়ে নেন। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক দেলোয়ার স্যারকে পরে অভিযোগ জানালে উনি বলেন- ওদের সাথে তাল মিলিয়ে চল না কেন? হায়রে!!!

সেদিন চ্যালেঞ্জ করেছিলাম স্যারকে- এ রকম শুধু আমাকেই না, আরো ১৭ টি নির্যাতনের ঘটনা কিছুদিনেই ঘটেছে। অথচ যারা ভুক্তভোগী তাদের বিরুদ্ধে একটা মাত্র বুয়েটের শৃংখলা ভঙ্গ বা কারো সাথে ঝামেলার ঘটনার প্রমাণ দেন। আর যারা নির্যাতন করছে- তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কত গুণ্ডামীর প্রমাণ লাগে বলুন।

আল্লাহ তুমি সাক্ষী…….

আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগ ওরা প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু আমার এই ছবিগুলো তখনই প্রচার হয় বলে ওরা এতে ব্যাপক ক্ষেপে যায়। পাশাপাশি বুয়েট শিক্ষক সমিতি এর বিচারের দাবী জানিয়ে লিখিত বিবৃতি দিয়েছিল। আমাকে ওরা এজন্য ক্যাম্পাসেই ঢুকতে দিতো না, মৃত্যুর হুমকি দিত। এসব দেখে অন্য নির্যাতিত আরও অসংখ্য ছাত্র নির্যাতিত হলেও প্রকাশ করতো না। নইলে বুয়েটে পড়াশোনা কন্টিনিউ করাই সম্ভব হবে না ওদের। সেদিন দলকানা ছাত্রকল্যাণ পরিচালক চরম অসহযোগিতা করেছেন। পক্ষান্তরে নিরপেক্ষ শিক্ষকেরা অপমান সহ্য করেও আমাকে উদ্ধার করেছেন।

দলকানা শিক্ষকেরা সব সময় স্বার্থবাদী হয়। আমি জীবন নিয়ে ফিরতে পারলেও আবরার জীবন দিল। এভাবে অপরাজনীতির শিকার আরও কত জীবন হবে তা ভাবা অসম্ভব। এসব অপরাজনীতি থাকলে ক্যাম্পাসে রক্ত ঝরবেই। তাই নির্যাতিত ছাত্র হিসেবে দাবী জানাই-

ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হোক,

ছাত্র এবং শিক্ষকদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক। আমি বুয়েটিয়ান হিসেবে লজ্জিত নই, লজ্জা তাদেরই পাওয়া উচিৎ, যারা অন্যায় করেছে অথবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে। ভালোবাসি বুয়েট, ভালোবাসি বাংলাদেশ।

 

সরকারি তিতুমীর কলেজের সালমা তার ওয়ালে লিখেছেন, স্ট্যাটাস দিতেই ভয় লাগে কারন আবরার তোর মতো যদি আমাকে ও এই নির্মমতার বলি হতে হয়! বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে এই নিষঠুর শহরে এসেছি স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করতে ঠিক আমার মতো তুই (আবরার ফাহাদ) ও এসেছিলি, কিন্তু ওরা তোর স্বপ্ন গুলো বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই পরোপারের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলো ভগ্যিস আমি বেচে গেছি!

তোর মত সত্যি কথা বলার সাহস আর দেশপ্রেম আমার মধ্যে নেই। এটা আমার জন্য অনেক লজ্জাজনক হলেও আমার বাবা, মা, ভাই বোনের জন্য আনন্দের কারন। বাবার কাধে সন্তানের লাশ অনেক ভারী রে তুই!

শহীদ হয়েতো বেঁচে গিয়েছিস, আমিও বেঁচে যাবো কোন দিন এইদেশে থেকে অন্য কোন দেশে গিয়ে স্থায়ী হয়ে যাবো কিন্তু তোর আর আমার মধ্যে পার্থক্য কোথায় যানিস? আমি ভীরু তুই সাহসী। লোকজন বলবে আমি দেশের বাহিরে স্যাটেল কিন্তু আমি বলবো দেশ পলাতক।

আচ্ছা ভাই তোরে এত পরিমান মারলো তুই কি আকুতি মিনতি করিস নাই? নাকি তুই জিদ করে বসে ছিলি! ভাবছিলি কত আর মারবে! আমিতো তাদেরই ভাই। আচ্ছা এই ৬ ঘন্টায় একটু ও কি পানি চাস নাই? তুই তো পড়তে বসলেও চিপস খাস তোর কি একটু ও খুধা লাগে নাই? তোর চিল্লানির শব্দ কি কেউ শুনতে পায় নাই? তোর ওই নিস্পাপ চেহারার দিকে কেউ তাকিয়ে একটু ও কি মায়া করে নাই? অনেক ইচ্ছা ছিলো আমার ভাইকে ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াবো। আমার স্বপ্ন আমি পূরন করতে পারি নাই তাই ভাইকে দিয়ে আমার লালিত স্বপ্ন পূরন করবো। কিন্তু আমার তো একটাই ভাই তোর নির্মম হত্যার কথা যখন আমার কানে প্রবেশ করলো নিজের অজান্তে তখন দুই চোখ বেয়ে শুধু পানি পড়লো। যানিস আবরার তোর ঐ নিস্পাপ চেহারা দেখে আমার ছোট্ট ভাইটি কথা খুব মনে পরছে যাকে কোলে পিঠে নিয়েছি, আর ভাবছি যে তুই তো আমার ভাই এর মতো।

যে দেশের জন্য ৫২ সালে ছাএরা একত্রিত হয়ে লড়াই করছে আর আজ তুই সেদেশের জন্য বলাতে পৃথীবির আলোটুকু দেখার অধিকার দেয়নি তোরই সহপাঠি এবং কথিত বড় ভাইরা।হায়রে ছাত্র রাজনীতি। তুই কি জানস না দেশটা ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে গেছে?? এসব তুই জানবি ই বা কি করে তুই তো সারাদিন পড়াশুনা আর রিসার্স নিয়ে থাকতি সমসাময়িক ব্যপারটা তোর চোখে পরাতে তুই স্ট্যটাস দিছিস দেখ এই একটুতেই তোকে মেরে ফেললো মানুষরুপী সহপাঠি আর বড় ভাই নামক হায়নারা।

আমার দৃস্টিকোন থেকে শিক্ষার্থীরা (আমরা) ক্যাম্পাসে আসি পড়াশুনার জন্য রাজনীতি চর্চা করতে নয়, যার রাজনীতি করা দরকার তার জন্য রাজনৈতিক অংঙ্গনে আছে শিক্ষাঙ্গনে নয়।বর্তমান রাজনীতি হচ্ছে এক ধরনের চামচামি, মারামারি, কাটাকাটি ইত্যদি সব নোংরামি যার দ্বারা একটা ছাত্র /ছাত্রী কি শিক্ষা লাভ করতে পারে?? ছাত্ররাজনীতি যদি ছাত্রদের কল্যানের জন্যই হয়ে থাকে তাহলে এক ছাত্র ভাই অন্য ছাত্র ভাইকে কেন নির্মমভাবে হত্য করবে?? ক্যাম্পাসে ছা্ত্র রাজনীতি নামক আতঙ্ক আর নির্মমতা বন্ধ করা হোক একটা ছাত্র সংসদ চাই প্রত্যেক ক্যাম্পাসে যা ছাত্রদের দ্বারা নির্বচিত ছাত্রদের পক্ষে কথা বলবে। আমরা নোংরা রাজনীতি চাই না যার জন্য নিয়মিত আবরার এর মত নিরাপরাধ সহজ সরল কোন সন্তান এর জীবন বলি দিতে হয় । কোন ভাইকে এভাবে যেন হারাতে না হয় আর কোন মায়ের বুক খালি না হয়, ছাত্র রাজনীতি বাতিল।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ