আবুল কালাম আজাদের গল্প ‘ঝুলে আছে মানবতা’

প্রকাশিতঃ ২:৩২ অপরাহ্ণ, বুধ, ১৫ জানুয়ারি ২০

নিলীমা বলল: বাজান, আমি একটা কথা কইতে চাই।
হাসমত আলী তাকালো মেয়ের মুখে। মায়ের অসুখের এই কয়দিনে মেয়ের মুখটা অনেকটা উজ্জ্বলতা হারিয়েছে। দুধে-আলতা গায়ের রঙটা কেমন শেষ রাতের চাঁদের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। এই বয়সে তার মাথায় অনেক চিন্তা। চিন্তা মাকে নিয়ে। ছোট ভাইটাকে নিয়ে।
রহমত আলী বলল: নাস্তা করছো মা?
: হ’, লিটন দুই টুকরা পাউরুটি রাইখা দিছিল। আলু তরকারি দিয়া সেই পাউরুটি খাইছি। আলু তরকারি দিয়া পাউরুটি খাইতে অনেক ভাল্লাগে।
: তায়লে তুমার মায়ের মাথায় একটু তেল দিয়া দ্যাও।
: আমি একটা কথা কইতে চাইছিলাম…….।
রহমত আলী চুপসে গেল। মেয়ের কথাটা সে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সে তা বলবেই। নিশ্চয় সংসারের অভাব-অনটন, মায়ের চিকিৎসা এসব ব্যাপারে সুবিধা হবার মত কিছু বলবে। এতটুকু মেয়ের কাছ থেকে এসব ব্যাপারে পরামর্শ নিতে রহমত আলীর ভালো লাগে না। নিজেকে আরও বেশি ব্যর্থ, অযোগ্য মনে হয়। অযোগ্য পিতা। অযোগ্য স্বামী। অযোগ্য পুরুষ।
রহমত আলী মাথা নিচু করে রইল। নিলীমা বলল: বাজান, ঢাকায় বাসা-বাড়িতে কাজের জন্য অনেকে মাইয়া রাখে। খাওন দেয়, কাপড়-চোপড় দেয়, কিছু বেতনও দেয়। সিদ্দিক ভাই কাইল কইলো……..।
রহমত আলীর চুপসে যাওয়া মুখটা বিষন্নতায় ছেয়ে গেল। কষ্ট, লজ্জা, অপমান সবকিছু একযোগে এসে চারিদিক থেকে তার বুকে-পিঠে সপাং সপাং করে চাবুক মারতে লাগলো। এতটুকু মেয়ে, এত আদোরের মেয়ে এসব কী বলছে?
রহমত আলী ক্ষেপে যাওয়া ষাঁড়ের মত চিৎকার করে উঠল: আমি তোরে লেহাপড়া শিখামু! আমি তোরে শিক্ষিত বানামু।
নিলীমা বুদ্ধিমতি মেয়ে। বাবার মনের অবস্থা ধরতে পারল। বলল: বাজান, আমি তো অল্প কিছুদিন কাজ করুম। মায়ের অসুখটা সারলেই চইলা আসুম। আইসা লেহাপড়া করুম।
: তুই পরীক্ষা দিবি ক্যামনে?
: এই বছর পরীক্ষা না দিলাম। এক বছর বাদ গেলে তেমন কিছু হইবো না। সিদ্দিক ভাই কইছে…..।
: কী কইছে?
: সে যে গার্মেন্টে চাকরি করে, সেই গার্মেন্টের মালিকের বাসায় একটা মাইয়া লাগবো আমার বয়সী। থাকা, খাওয়া ছাড়াও মাসে দুই হাজার ট্যাকা বেতন দিবো। তুমি মায়রে ভালো চিকিৎসা করাইতে পারবা। মা সাইরা উঠলেই আমি আইসা আবার লেহাপড়া শুরু করুম।
: শুনছি, ঢাকার মানুষরা কাজের পোলামাইয়াগো নির্যাতন করে।
: সবাই তা করে না। সেই মালিকের বউ নাকি মানবতাকর্মী।
: মানবতাকর্মী কী?
: তা তো জানি না। সেইটা সিদ্দিক ভাই কইতে পারব। তুমি কাইল সিদ্দিক ভাইয়ের সাথে কথা কও। সবার আগে আমাগো মা। তারপর অন্য কিছু। চিকিৎসার অভাবে মা মইরা গেলে আমাগো দুই-ভাই বোইনের কী হইবো?
রহমত আলী আঁৎকে ওঠে। স্ত্রীর মৃত্যু আশঙ্কা তাকে কাঁপিয়ে দেয়। ফুলবানুকে সে অনেক ভালোবাসে। ভালোবেসেই বিয়ে করেছে। ফুলবানু ছাড়া জীবনকে সে ভাবতে পারে না। বিয়ের পর থেকে ফুলবানুও অপার ভালোবাসা ও সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে তাকে আগলে রেখেছে। পরিবারের সব কাজ নিজ হাতে করার পরও ফুলবানু হাঁস-মুরগি পুষেছে। শাক-সবজির বাগান করেছে।
রহমত আলী অন্যের বাড়ি কামলা খাটে। দুই/তিনদিন কাজ না পেলেও সমস্যা হয় নাই। স্ত্রী হাঁস-মুরগির ডিম, সবজি ইত্যাদি বিক্রির টাকা দিয়ে চালিয়ে নিয়েছে।
মাস দেড়েক হল স্ত্রী শয্যাশায়ী। জ্বর আসে মাঝে মাঝে। কাশি হয় খুব। মাঝে মাঝে কাশতে কাশতে গলা দিয়ে রক্তের ছিটাও আসে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ভীষণ হাঁপাতে থাকে। বুক ধরপর করে। নড়াচড়ার শক্তি নাই।
রহমত আলী ঠিকমত কাজে যেতে পারছে না। এই দেড় মাসে ডিম বিক্রির পাশাপাশি কিছু হাঁস-মুরগিও বিক্রি করে ফেলেছে। হাতে টাকা নেই। স্ত্রীকে ভালো ডাক্তার দেখাতে পারছে না। কম্পউন্ডারের কাছ থেকে কিছু ওষুধ আনে। সেসব খেয়ে বিশেষ উপকার হচ্ছে না। উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে নিতে পরলে ভালো হত। লক্ষ্মী বউটা বিনা চিকিৎসায় মরে যাবে সে কথা ভাবলে নিজেরই আগে মরতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সে তো মরতে পারবে না। দুটি ছেলে-মেয়ে আছে যে।
***
সিদ্দিক বলল: চাচীর অবস্থা তো দিন দিন খারাপ হয়া যাইতেছে।
রহমত আলী বলল: চিকিৎসা করাইতে পারতেছি না। খাওনই চলে না ঠিকমতো। কামে যাইতে পারতেছি না……..।
: নীলিমারে আমার সাথে দিয়া দেন। হাজার দুই ট্যাকা বেতন পাইবো। আরও কিছু বেশিও দিতে পারে। ছয় মাস থাইকা আইসা আবার লেহাপড়া শুরু করবো। বছর লস হইব না। ওর যা বুদ্ধি! দুই মাস পইড়া ফাইনাল পরীক্ষা দিলেও ফাইভে উইঠা যাইব। এর মধ্যে আপনে চাচীর চিকিৎসাটা করায়া ফেলতে পারবেন।
রহমত আলী চুপচাপ বসে থাকে। সিদ্দিক মন্দ কিছু বলে নাই। মন্দ কিছু বলার মত ছেলে সে না। রহমত আলীর দুঃসম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্দিক। রহমত আলীকে সে আপন চাচার মতোই সম্মান করে। লেখাপড়া শিখে বড়ো মানুষ হওয়ার সাধ ছিল তার। স্কুলে ভালো ছাত্র হিসাবে সুনাম ছিল। অসময়ে বাপটা মরে যাওয়ায় তার সব স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেল। এখন সে গার্মেন্টে চাকরি করে। মাকে নিয়ে কোনোমতে আছে। যেখানে চাকরি করে সেখানে সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। বাড়িতে এলে গ্রামের সবার সাথে দেখা-সাক্ষাত করে, হাসি মুখে কথা বলে। মুরুব্বিদের সম্মান করে।
সিদ্দিকের সাথে নীলিমাকে পাঠাতে ভয়ের কিছু নেই। তবে মেয়েটা কাছে থাকবে না, এ কথা ভাবলে রহমত আলীর বুকের ভেতর জ্বলে যায়। বুকটা কেমন হু হু করে ওঠে।
রহমত আলী কিছু বলছে না দেখে সিদ্দিক বলল: আমার মালিক খুব ভালো মানুষ। তার স্ত্রী মানবতাকর্মী।
ঝট করে মাথা তুললো রহমত আলী। ‘মানবতাকর্মী’ জিনিসটাই সে সিদ্দিককে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল। কিন্তু শব্দটা মাথা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। রহমত আলী বলল: মানবতাকর্মী কী?
: তারা অসহায় মানুষের জন্য কাজ করে। বিশেষ করে নারী আর শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করে। কেনো জায়গায় কোনো নারী বা শিশু নির্যাতনের খবর পাইলে তাগোরে উদ্ধার কইরা, আইনী সহায়তা দেয়।
: তায়লে তো ভালোই।
: হ, নীলিমার সেইখানে কষ্ট হইবো না।
: দেখি ওর মা কী কয়।
: চাচীর সাথে কথা কয়া দেখেন। কালকের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাইবেন। পরশু সকালে আমি চইলা যাব। ছুটি নাই।
***
ফুলবানু অনেকক্ষণ কাঁদলো। রোগে এতটা কাহিল যে, কান্নার শক্তিও নেই। এতদিন ধরে কাশতে কাশতে গলা বসে গেছে। পাখির ছানার মত চিঁ চিঁ শব্দ বের হয় গলা দিয়ে।
রহমত আলী বলল: সিদ্দিক যেমন কইল, তাতে মনে ভরসা পাই। মাইয়ারে মাস ছয়েকের বেশি চোখের আড়ালে রাখতে হইব না। আর যদ্দুর মনে হয়, তুমার অসুখটা জটিল কিছু না। ভালো একজন ডাক্তর দেখাইয়া ওষুধ খাওয়াইলেই তুমি ঠিক হয়া যাইবা। তারপরই মাইয়ারে নিয়া আসুম।
ফুলবানু চিঁ চিঁ শব্দে বলল: মাইয়ারে আমি কোনোদিন চোখের আড়াল করি নাই। মাইয়াডা আমার লেহাপড়ায় কত ভালো। বুকের মধ্যি কেমন পুইড়া যায়!
: সবই বুঝি। তুমার চিকিৎসাটা তো করাইতে হইব। তুমি না থাকলে পোলা-মাইয়া দুইডার……। একবার ভাবো…। কয়টা দিন নয় আমরা কষ্ট করি। আর নীলিমার সাথে তো আমিও যামু। সেইরকম কিছু বুঝলে মাইয়ারে ফিরায়া নিয়া আসুম।
***
নীলিমার বিদায় বেলায় অনেক কষ্টে হলেও ফুলবানু বাড়ির নিচ পর্যন্ত মেয়েকে এগিয়ে দিতে এল। মেয়েকে বার বার বুকে চেপে ধরছিল। কেঁদে বেহুশ হয়ে যাবার মত অবস্থা। রহমত আলী এদিক-ওদিক চোখ ফেরাচ্ছিল। ঘাম মোছার ছলে বার বার পিঠের গামছা দিয়ে মুখ মুছছিল। তাকে শক্ত থাকতে হবে। সে ভেঙে পড়লে অসুস্থ স্ত্রী আরও ভেঙে পড়বে।
পাড়া-প্রতিবেশীরাও অনেকে এসেছে। নীলিমাকে সবাই ভালোবাসে, আদোর করে। আদোর-ভালোবাসা পাবার যোগ্য মেয়ে নীলিমা। পাড়া-প্রতিবেশীরা বলতো, গরিবের ঘরে এমন বুদ্ধিমতী আর লক্ষ্মী মেয়ে খুব কম হয়। পাড়া-প্রতিবেশীদের চোখের কোণেও জলের বিন্দু।
নীলিমা ডাগর চোখে সবার মুখে তাকাচ্ছিল। গোটা পাড়া, দৃষ্টি আরও প্রসারিত করে গোটা গ্রামটাকে দেখছিল। এই পাড়া, এই গ্রাম তার খুব প্রিয়। প্রিয় সব মুখ। এত ছোট বয়সে যে এসব থেকে বিচ্ছেদ হবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। তারপরেও সে নিজেকে শক্ত রাখে। অসুস্থ মায়ের জন্যই সে কাজ করতে যাচ্ছে। মায়ের সুস্থতা সবার আগে। এ ছাড়া যে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। ছোট ভাইটার কাছে গিয়ে নিজেকে পুরোপুরি সামলে রাখতে পারল না। চোখের বাঁধ ভেঙেই গেল। লোনা জলের স্রোত নেমেই গেল।
সিদ্দিক বুঝল, এই মুহূর্তে তাকে কথা বলতে হবে। সে ফুলবানুকে কাছে টেনে বলল: চাচী, কোনো চিন্তা করবেন না। আমি তো আছি। নীলিমার কোনো কষ্ট হইব না।
: তুমি আছো বইলাই তো ভরসা পাই বাবা। নইলে কি কলিজার টুকরাটারে দূরে ঠেইলা দেই?
: চাচী, আমার তো কোনো ভাই-বোন নাই। এক মা ছাড়া দুনিয়ায় আপন বলতে আপনারাই। নীলিমা আমার বোন।
উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে সিদ্দিক বলল: চাচী সুস্থ হয়া উঠলেই সব আগের মতো হয়া যাইবো। নীলিমা ফিরা আইসা আবার স্কুলে যাইবো। কতদিন চাচীর হাতের কঁচি লাউ দিয়া জিওল মাছের ঝোল খাই না।
ফুলবানু বলল: বাবা, তুমি আমার কলিজা ঠান্ডা কইরা দিলা। আমি সুস্থ হয়া তুমারে জিওল মাছের ঝোল তরকারি খাওয়ামু।
রহমত আলী তাড়া দিল: চলো চলো, নইলে গাড়ি ধরতে দেরি হয়া যাইবো।
***
রহমত আলী ঢাকা থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে যা বলল তাতে ফুলবানুর মনের কষ্ট অনেকটা কমল।
রহমত আলী বলল: বুঝলা, মানুষ যেমুন বড়ো, মনও তেমুন বড়ো। আমার মতো গাঁওয়া ফকিররেও কি যে সম্মান করল!
: মানবতাকর্মী না কী য্যান তিনি।
: মানবতাকর্মী। মুখের কথা য্যান মধু! কি সোন্দর কইর‌্যা কথা কইলেন! আমার মাইয়াডারে নিজের মাইয়ার মনে কইরা বুকে টাইনা নিলেন। আমার জন্যি কত্ত ভালো ভালো খাওন! ঐরকম চেয়ার-টেবিলে বইসা কি খাইতে পারি, কও?
: হিহিহি।
: তুমি হাসো! ভাত মুখে দিতে গেলে হাত থিকা পইড়া জামার ভিত্রে ঢুইকা যায়।
: হিহিহি।
: এক মাসের বেতন অগ্রিম দিয়া কইলেন, বাড়ি গিয়ে বউকে ভালো ডাক্তার দেখান। আরও টাকা লাগলে আমাকে ফোন দিবেন। আমি পাঠিয়ে দিবো।
: হিহিহি।
: সব কথাতেই হাসো। তুমার হইছে কী কওতো?
: আপনে তো শহরের ভদ্দলোকের মতো কথা কইতেছেন।
: নইলে তো তুমি বিষয়ডা বুঝবা না।
: বুঝছি, আমি খুবই বুঝছি যে, দুনিয়ায় এহনও ভালো মানুষ আছে।
: তা ছাড়া, সিদ্দিকও আমারে এক হাজার টাকা দিছে।
: তুমি সিদ্দিকের কাছ থিকা ট্যাকা আনলা ক্যান? পোলাডা সামান্য কিছু বেতন পায়…..।
: জোর কইরা দিল। পাগল একটা। কয়-দুই হাজার ট্যাকা তো চাচীর ডাক্তর-ওষুধেই যাইবো। চাচীরে একটু ভালো কিছু খাওয়াইনে।
: ও য্যান আমার প্যাট থিকা জন্মাইছে। ফুলবান আঁচলে চোখ মুছতে লাগলো।
রহমত আলী বলল: কাইল তুমারে উপজেলায় নিয়া পাস করা ডাক্তর দেখামু। তারপর দরকার হইলে জেলা সদর হাসপাতালে নিমু। দুই হাজার ট্যাকা যে এইভাবে অগ্রিম পামু তা ভাবতে পারি নাই। ও ভালো কথা, সেই বাসা কয় তলার উপ্রে জানো?
: কয় তলার উপ্রে?
: পনরো তলার উপ্রে।
: কন কী! অতো উপ্রে উঠলেন ক্যামনে? আমার মায় ক্যামনে উঠল?
: হাহাহা।
: হাসেন ক্যান? হাসোনের কথা কইছি কোনো?
: পনরো তলায় উঠা খুব সহজ। লিফটে খাড়ায়া পনরো লেখা বোতামে টিপ দিলেই……..।
: লিফট কী?
: যেইটা দিয়ে উপ্রে উঠে আর নিচে নামে।
: দুই দিনেই কত কিছু শিখা আসছেন।
: দুই মাস পর আবার যখন বেতন আনতে যাব, তখন আরও কিছু শিখে আসব।
: আবার আপনে ভদ্দ লোকের মত কথা কইতেছেন?
: হাহাহা।
রহমত আলী ফুলবানুকে উপজেলা শহরে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখালো। ডাক্তারের পরামর্শে ব্লাড টেস্ট করিয়ে দেখা গেল জ্বরটা সাধারণ। হাঁপানির সমস্যাটা প্রকট। ঠান্ডা লেগে বুকে কফ জমেছে। ডাক্তার ওষুধ দিলেন। বললেন: এই ওষুধগুলো নিয়োমিত সেবন করলে সমস্যা থাকবে না। হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার নেই।
রহমত আলী বলল: ডাক্তার সাব, অনেক দিনের সমস্যা তো।
: সাধারণ ঠান্ডা জ্বরকেই চিকিৎসা না করিয়ে জটিল করে ফেলেছিলেন। হাঁপানির সমস্যা থাকার কারণে রোগি বেশি কাহিল হয়ে গেছে। চিন্তার কিছু নেই। ওষুধগুলো ঠিকমতো সেবন করান।
ডাক্তারের কথাই ঠিক হলো। ওষুধ পেটে পড়তে না পড়তেই ফুলবানুর কাশির পরিমাণ কমে গেল। জ্বরও আসে না। তিন/চার দিনের মধ্যেই সে প্রায় ঝরঝরে। হাঁটাচলা করতে পারে। চিকিৎসায় সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে মাত্র পনেরোশ’ টাকা। সিদ্দিকের এক হাজার টাকা অক্ষত ছিল। সে টাকা দিয়ে চাল, ডাল, সবজি, মাছ ইত্যাদি কিনে আনল। তারপর রহমত আলী নিশ্চিন্ত মনে কাজে গেল।
কয়েক দিনের মধ্যেই ফুলবানু স্বাভাবিক হাঁটাচলা শুরু করল। জ্বর আসে না। কাশি কম। বুকে ব্যথা হয় না।
ফুলবানু নতুন করে হাঁস-মুরগি ও সবজি বাগানের দেখাশোনা করতে শুরু করল। ফুলবানুকে দীর্ঘদিন পর নিজেদের মাঝে পেয়ে হাঁস-মুরগিগুলোর সে কি আনন্দ! তাকে ঘিলে লাফালাফি শুরু করে দিল। ককর-ককর।
নীলিমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা সবার। কিন্তু মানবতাকর্মী ভদ্রমহিলা যে ফোন নম্বরটা দিয়েছিলেন সেটাকে সব সময়ই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। শেষে রহমত আলী সিদ্দিককে ফোন করল: বাবা, কেমন আছো?
: চাচা, আমি ভালো আছি। চাচীর শরীর কেমন? ডাক্তর দেখাইছেন?
: হ বাবা। উপজেলায় নিয়া ডাক্তর দেখাইছি। রক্ত পরীক্ষা করাইছি। কঠিন কিছু না। ডাক্তর ওষুধ দিছেন। ওষুধ খাওয়ার পর তুমার চাচী এখন প্রায় পুরাই সুস্থ। হাঁটা-চলা, কাজ-কাম করতে পারতেছে। আমিও কয়দিন হইল কামে যাইতেছি।
: তাই! খুব শান্তি পাইলাম মনে। ডাক্তর যেমুন যেমুন ওষুধ খাওয়াইতে কইছেন তেমুন খাওয়াইয়েন।
: তা বাবা, নীলিমার সাথে একটু কথা কইতে চাইছিলাম। সেই নম্বরটা তো বন্ধ।
: তাদের নম্বারের তো ঠিক-ঠিকানা থাকে না। অনেকগুলা ফোনে নম্বর ব্যবহার করেন। কোনটা কোনসুম বন্ধ থাকে…..। আমি তো আমার স্যারের সাথে প্রায়ই নীলিমার বিষয়ে কথা কই। নীলিমা ভালো আছে।
: তুমার চাচী নীলিমার সাথে কথা কইতে চায়। অনেকদিন মাইয়াডারে দেখে না তো।
: ঠিক আছে, আমি স্যারকে কইয়া কথা কওয়াইয়া দিব।
: আর বাবা……।
: বলেন চাচা।
: তুমার চাচী তো এখন সুস্থ। আমি কামে যাইতে পারতেছি। নীলিমারে আমরা নিয়া আসতে চাই।
: চাচী সুস্থ হয়া গেলে তো আর নীলিমারে রাখার দরকার নাই। চাচীর জন্যই তো ওরে আনা। এক মাসের বেতন তো এ্যাডভান্স দিছে। আগামি মাসে তো বেতন নিতে পারবেন না। তার পরের মাসে যখন বেতন নিতে আসবেন তখনই নীলিমারে নিয়া যাইতে পারবেন। তারা আটকাইবো না। তারা খুব ভালো মানুষ।
: ঠিক আছে বাবা, তার পরের মাসেই যামু। তুমি তাগোরে একটা মাইয়া খুঁইজা দিতে পারো কি না দেখো। তারা খুবই ভালো মানুষ।
: সেইদিক আমি দেখুমনে।
***
নীলিমাকে ফিরিয়ে আনতে আরও দুই মাস। দুই মাস মানে ষাট দিন। একেকটা দিন যেন একেকটা বছর।
ফুলবানু বলল: এখন থিকা কিছু কিছু ট্যাকা জমাইতে শিখেন, যাতে কারও অসুখ-বিসুখ হইলে এমন বিপদে না পড়তে হয়।
রহমত আলী বলল: তুমি ঠিক কইছো বউ। চরম শিক্ষা পাইছি। না পারি তুমারে চিকিৎসা করাইতে, না পারি কামে যাইতে। কলিজার টুকরাটারে দূরে পাঠাইতে হইল।
: মাইয়া আমার কুনুদিন মানুষের বাড়িতে কাম করবো তা স্বপনেও ভাবি নাই। ফুলবানু আঁচলে চোখ মুছতে লাগলো।
রহমত আলী বলল: যা হওনের হইছে। দুই মাস পরে তো মাইয়া আসতেছেই। তোমার গাছের লাউ, কুমড়া, ঝিংগা, হাঁস-মুরগি, ডিম এইসব বেচার ট্যাকায় আমি আর হাত দিমু না। আর শোনো, মাইয়ারে যখন আনতে যামু তখন তাগোর জন্য কিছু দিয়া দিও। বড় ভাল মানুষ তারা। তাগোর জন্যই তুমি এই যাত্রা রক্ষা পাইলা। যদি এক মাসের বেতন অগ্রিম না দিতো……! মানবতাকর্মী কী জিনিস তা বুঝবার পারছি।
: কিছু ডিম, কুমড়া, লাউ, আর লাউশাখ, পুঁইশাখ এইসব দিতে পারুম।
: এইসব দিলেই তারা খুশি হইব। গাঁও-গেরামের এইসব তাজা শাক-সবজি তো তারা পায় না।
দিন সাতেক পর সিদ্দিক ফোন করে বলল: চাচা, তারা একটা মাইয়া পাইছে। আপনে নীলিমারে নিয়া যাইতে পারবেন। আমার স্যার কইলেন, মাইয়াটা লেখাপড়ায় ভালো। এইভাবে তার ক্ষতি করা ঠিক হইবো না। তাছাড়া মাইয়াটার মা যখন সুস্থ হয়া গ্যাছে……।
সিদ্দিকের কাছ থেকে এ খবর পেয়ে রহমত আলী এবং ফুলবানু খুবই খুশি হয়। খাস দিলে মানবতাকর্মী আর তার স্বামীর মঙ্গল কামনা করে।
রহমত আলী বলে: ঢাকায় সোন্দর সোন্দর দেখার জিনিস আছে। সিদ্দিকরে সাথে কইরা চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক এইসব দেখায়া আনবো। আবার কবে যাই না যাই…..।
পাশ থেকে ফস করে ছেলেটা বলে: বাজান, আমি শিশুপার্ক দেখুম, আমারে নিয়া যাও।
রহমত আলী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে: বাজান, তুমারে আর তুমার মা’রে একসুম নিয়া যামু। তখন তুমিও সব দেইখা আসবা।
***
পনেরো তলা দালানের মোড়ে গিয়ে রহমত আলী রিকশা থেকে নামল। রিকশা আর সামনে যাবে না, মানে যেতে পারবে না। গাড়ির জ্যাম নয়, মানুষের জটলা। মানুষ আকাশের দিকে চেয়ে আছে, আর খুব চেঁচামেচি করছে। চেঁচামেচি ঠিক না, হা-হুতাশ। মানুষ চিৎকার করছে-তুমি শক্ত করে রেলিং ধরে রাখো। ভয় পেয়ো না। কার্ণিশ থেকে পা যেন না ছোটে। তোমাকে উদ্ধার করতে লোক আসছে। পুলিশ আসতেছে। ফায়ার ব্রিগেড আসতেছে।
কেউ কেউ বলছে-পুলিশ এখনও আসে না কেন? ফায়ার ব্রিগেডের আসতে এত দেরি হয় কেন?
রহমত আলী কিছুই বুঝতে পারছিল না। আকাশে কে দাঁড়িয়ে আছে? কাকে তারা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলছে? আকাশে কি রেলিং আছে?
রহমত আলী ঠান্ডা মাথায় রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দেয়। তার দুই হাতে কয়েকটা ব্যাগ। তাতে ডিম, শাক-সবজি, লাউ ইত্যাদি। দুইটা মুরগিও আছে। মুরগি দুইটা ককর ককর করছে।
রহমত আলী ভিড় ঠেলে সামনে এল। উপস্থিত লোকজনের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে, ঘাড় বাঁকা করে তাকাল ওপরে। তিনতলা, চারতলা, পাঁচতলা…….পনেরো তলায় তাকিয়ে দ্যাখে একটা মেয়ে গ্রিলের বাইরে কার্ণিশে পা রেখে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রহমত আলী খুব ভালো করে মেয়েটাকে দেখলো। তারপর হাতের ব্যাগগুলো ছুড়ে ফেলে “আমার বুকের মানিক ঐখানে ঝুইলা আঝে ক্যান?”-বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে মূর্ছা গেল। মুরগি দু’টো ভয় পেয়ে প্রাণপন ককর ককর করতে লাগলো। ডিম ভেঙে হলুদ কুসুম ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। উপস্থিত জনতার কেউ কেউ প্রশ্ন করল-মেয়েটি কি তার……..?
ফায়ার ব্রিগেড এল। পুলিশ এল। তারা পনেরো তলায় গিয়ে বারান্দার গ্রিলের দরজার তালা খুলে নীলিমাকে ভেতরে নিল।
সিদ্দিক এসে রহমত আলীর চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে তার জ্ঞান ফেরালো। বলল: চাচা, চিন্তা নাই। নীলিমারে উদ্ধার করছে। আপনে নীলিমারে নিয়া বাড়ি যাইবেন।
পুলিশের সাথে কথা বলার জন্য সেই বাসায় যেতে হল। মানবতাকর্মীর বাসা। নীলিমার দিকে তাকিয়ে রহমত আলীর চোখের ধারা থামে না, বুক ফেটে যায়। তার নাদুস-নুদুস ফর্সা মেয়েটা এই কয়দিনে এমন কঙ্কাল হয়ে গেছে কেন? বড় বড় ডাগর চোখ নীলিমার। সেই চোখ অমন গর্তে ঢুকে গেছে কেন? হাতে-পায়ে কালো কালো দাগ। কিসের দাগ ওগুলো?
পুলিশ সব দেখলো, যা শোনার শুনল। তারপর বলল: আপনারা যদি মামলা করতে চান তো থানায় গিয়ে মামলা করতে পারেন। কোর্টে গিয়েও করতে পারেন।
সঙ্গে সঙ্গে সিদ্দিক কঠিন কন্ঠে বলে উঠল: আমরা মামলা করবো।
মানবতাকর্মী নারী আগুন চোখে তাকালো সিদ্দিকের দিকে। পুলিশের সামনেই হুঙ্কার ছাড়ল: তুই আমার অফিসে চাকরি করিস!
: আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোই। আপনার অফিসে চাকরি করার চাইতে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটা আমার কাছে দরকারি। নারী ও শিশু অধিকার রক্ষার নামে বিদাশ থিকা কাড়ি কাড়ি টাকা পান। এই আপনাদের অধিকার রক্ষা? নীলিমা আমার বোন। যে বোনটা কোনোদিন ছোট একটা আম গাছে আম পাড়তে ওঠে নাই, তারে আপনে পনেরো তলার রেলিং ধইরা ঝুলায়া রাখেছেন। আপনেরে আমি এমনিই ছাড়–ম না।
***
থানার ইনচার্জ জিজ্ঞেস করলেন: মেয়েটা আপনার কে হয়?
সিদ্দিক বলল: নীলিমা আমার বোন।
: এবার বিস্তারিত ঘটনা বলেন।
সিদ্দিক বিস্তারিত বলল।
ইনচার্জ বললেন: ভেরি স্যাড। মায়ের অসুস্থার জন্য বিপদে পড়ে মেয়েটা কাজ করতে এসেছে। আর তাকে…..! ভেরি স্যাড।
বাড়ি ফেরার পথে বাসে বসে রহমত আলী সিদ্দিককে বলল: বাবা, মামলা তো করলা। তাগোর কি কোনো শাস্তি হইব?
: না চাচা, তারা এতবড় রুই-কাতলা যে থানা-পুলিশ, আইন-আদালত তাগোরে ছুঁইতে পারবো না।
: তাহলে মামলা করলা ক্যান?
: এখনও এই দ্যাশে রুই-কাতলাগো বিরুদ্ধে চুনোপুঁটিরা অভিযোগ জানাতে পারে, এই সান্তনাটা পাওয়ার জন্য মামলা করলাম। একদিন হয়তো এই অধিকারটুকুও থাকবো না।
রহমত আলী একবার সিদ্দিকের মুখে, একবার নীলিমার মুখে তাকিয়ে, মাথা নিচু করে নিচের দিকে চেয়ে রইল।
নীলিমা তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। সারি সারি গাছগুলো পেছনে ছুটে যাচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ পেছনে পড়ে যাচ্ছে। তার প্রিয় গ্রাম এগিয়ে আসছে সামনে। পুরো গ্রাম, গ্রমের পরিচিত মানুষের মুখ, মায়ের মুখ, ছোট ভাইটার মুখ ভাসছে নীলিমার চোখে। কতদিন তাদের দেখে না! তার স্কুল, বাবার মত প্রিয়সব শিক্ষক, সব বন্ধু, একে একে সবাই এসে ভর করতে লাগল চোখের পাতায়।
নীলিমা! -সিদ্দিকের হঠাৎ ডাকে নীলিমা চমকে উঠল। চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সিদ্দিকের মুখে। সিদ্দিক বলল: আমার একটা কথা রাখতে হইবো বোন।
নীলিমা চোখের ভাষায় বলল; কী কথা সিদ্দিক ভাই?
: লেহাপড়া শিখা তুমি অনেক বড় মানুষ হইবা। জ্ঞানে-গুণে অনেক বড়। কিন্তু কোনোদিন অমানুষ হইবা না। এই দ্যাশে লেহাপড়া শেখা অমানুষের অভাব নাই।
নীলিমা তাকলো জানালার বাইরে। তাকালো আকাশে। বিশাল আকাশ। নীল-ঘন নীল আকাশ। মাঝে মাঝে তাতে লেপ্টে আছে দু/এক টুকরো সাদা মেঘ। আকাশে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নীলিমার কোটরাগত ডাকর চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি ঝরে পড়ল। নীলিমা ভাষাহীন কন্ঠে বলল: সিদ্দিক ভাই, শুধু লেহাপড়া শিখলেই মানুষ বড় হয় না। লেহাপড়া না শিখাও বড় মানুষ হওয়া যায়। যেমুন তুমি। তুমি অনেক বড় মানুষ সিদ্দিক ভাই। বড় মানুষ হওয়ার জন্যি লাগে নিস্পাপ বড় একটা মন। তুমার মধ্যি সেই মন আছে সিদ্দিক ভাই।

abulazad28@yahoo.com

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ