এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী ইতির গল্প সিনেমাকে হার মানায়

প্রকাশিতঃ ৭:১৯ অপরাহ্ণ, মঙ্গল, ১০ ডিসেম্বর ১৯

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে সোনায় মোড়ানো দিন কাটিয়েছে বাংলাদেশ আর্চারি দল। আর্চারির ৬টি ইভেন্টের সবকটিতেই সোনা জিতেছে বাংলাদেশ। রিকার্ভ দলগত ইভেন্ট ও রিকার্ভ মিশ্র ইভেন্টে সোনা জিতেছেন ইতি খাতুন।

দলগত ইভেন্টে সোনা জিতলেও ইতি খাতুনের নামটা আলাদাভাবেই উচ্চারিত হবে। ইতির সোনাজয়ের পেছনে গল্পটা যেন সিনেমাকে হার মানায়। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে যুদ্ধটা সেই ১১ বছর বয়স থেকেই করতে হয়েছিল ইতিকে। সে যুদ্ধে জিতেই আজ দেশকে সোনা জেতালেন তিনি।

বয়স তখন ১১, এ বয়সেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ইতির বাবা-মা। তবে ষষ্ঠ শ্রেণির ইতির স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়ার, এ বয়সেই স্বামীর ঘরে গিয়ে সে স্বপ্নকে কবর দিতে চাননি ইতি। তাই বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গেলেন। এরপর সোজা চলে গেলেন আর্চারি ফেডারেশনের ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায়।

চুয়াডাঙ্গার মেয়ে ইতির স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া। কিন্তু শৈশব পেরোনোর আগেই ইতিকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইতির বাবা-মা। তবে মেয়ের স্বপনের কাছে হারতে হয় বাবা-মায়ের। পরিবার ও সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইতি বিয়ের আসর থেকেই পালিয়ে যান। কখনো আর্চার হওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও তিনি এ খেলাতেই দেশকে জেতালেন সোনা। চুয়াডাঙ্গার ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় কোচদের নজরে আসেন। এরপর ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপলের। তার প্রচেষ্টাতেই ইতি আর্চার হয়ে ওঠেন। আর এখন তো দেশের জন্যই বয়ে আনলেন গর্বের মুহূর্ত।

প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের বেলগাছী মুসলিমপাড়া এলাকার দরিদ্র হোটেল শ্রমিক বাবা ইবাদত আলী কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘অভাবের সংসার আমার। মেয়েকে ঠিকমতো পড়াশোনার খরচও দিতে পারতাম না। কোনো রকমে চেয়ে-চিন্তে সংসার খরচের পাশাপাশি তার পড়াশোনা চালাতাম।

তাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু মেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে এক অভিনব প্রতিবাদ জানিয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল।’ বাল্যবিয়ে আয়োজনের জন্য দুঃখ প্রকাশও করেন তিনি। বলেন, ‘আমার মতো কোনো বাবা যেন তার সন্তানদের বাল্যবিবাহ না দেয়।’

ইতির মা আলেয়া খাতুন আনন্দে বাকরুদ্ধ। দেশের জন্য মেয়ের স্বর্ণজয়ের খবরে তিনি এখন এক গর্বিত মা। মেয়ের জন্য শুধু দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন।

স্কুলশিক্ষক-সহপাঠীরাও খুশি ইতির সাফল্যে।

চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক শামসুন্নাহার শিলা (ইতির স্কুল) বলেন, ‘স্বর্ণজয়ের এমন বিস্ময়কর খবরে আমরা দারুণ খুশি। ইতি এখন শুধু চুয়াডাঙ্গার নয় দেশের গর্ব।

চুয়াডাঙ্গা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নাঈম হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘ইতির এই সাফল্যের খবরে জেলার অন্য নারী আরচাররা উৎসাহিত হবে। সেই সঙ্গে দেশের খেলাধুলায় নারীদের অংশগ্রহণও আরও বাড়বে।’

আরচারি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও চুয়াডাঙ্গা আরচারির প্রশিক্ষণ কোচ সোহেল আকরাম বলেন, ‘প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পে ওকে দেখেই মনে হয়েছিল ওর মধ্যে প্রতিভা আছে। একদিন এ মেয়ে সবার মুখ উজ্জ্বল করবে মনে হয়েছিল। সেটা ইতি করে দেখিয়েছে।’

জেলার ক্রীড়া সংগঠক মাহবুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘ইতির বিস্ময়কর সাফল্যে চুয়াডাঙ্গার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।’

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ