করোনাকে মেরে নয়, নিজেই মরে গেলেন

প্রকাশিতঃ ১:৩২ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ১৬ এপ্রিল ২০

শফিকুল ইসলাম খোকন : আবহাওয়ার কোন পুর্বাভাস নেই, নেই ঝড়,জলোচ্ছ্বাস বা বৃষ্টি। অদেখা-অজানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার গোটা বিশ্ব। ফাঁকা রাস্তা, মাঠÐঘাট,গোটা বিশ্ব নিস্তব্দ, নিরবতা; নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার অবিরাম প্রচেষ্টা। সারিসারি লাশের সংখ্যা, বাবার লাশের পাশে আসছেনা সন্তান, স্বামীর লাশের পাশে দেখা মিলছেনা স্ত্রীর, স্ত্রীর লাশের পাশে স্বামীর দুরত্ব, ভাই ভাইকেও চিনছেনা যার নাম করোনা! চিকিৎসা নেই, জানাজা নেই, কোথাও কোথাও মাটি চাপা দেয়া হচ্ছে নিথর দেহগুলো। গোটা বিশ্ব যেন অভিশপ্ত,অস্থির। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের তাণ্ডবে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। করোনার করুণ ছোবলে বাংলাদেশর অবস্থাও করুণ দশা।

এ লেখাটি যখন লিখছি সারাবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও প্রতিদিনই মৃতের খবর শুনতে হয়। দিনদিন লাশের সারির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার সেই লাশের সারির সাথে মিলিত হচ্ছে চিকিৎসকও। আমরা কখনো বলে থাকি প্রকৃতি বড়ই নিষ্ঠুর! আমি এটি বিশ্বাস করিনা। হয়তো এর অর্থ বা ব্যাখা অন্য কিছুও হতে পারে, কিন্তু এটি আমার সম্পুর্ণ নিজস্ব মত। কারণ প্রকৃতি যদি নিষ্ঠুর হতো তাহলে এ পৃথিবী থাকতোনা, এ পৃথিবীর প্রাণীকুল বেচে থাকতোনা। থাকতোনা, মায়াÐমমতা, ভালোবাসা। মৃত্যূ তার নিজস্ব ভাবেই চলে। যখন মৃত্যূর ঘন্টা বাজবে কেউ তাকে মৃত্যূর হাত থেকে বাঁচাতে পারবেনা বা বাঁচানো সম্ভবও নয়।

করোনা যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা ডা. মঈন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হন ডা. মঈন। গত ৫ এপ্রিল তার করোনা পজিটিভ আসে। অবস্থায় অবনতি ঘটলে ৭ এপ্রিল তাকে সিলেট নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে করোনা ইউনিটে আইসোলেশনে রাখা হয়। সেখান থেকে পরবর্তী সময়ে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। করোনার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর চিকিৎসকের পরিবারসহ নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়।‘ নিজ গ্রামে বাবা-মায়ের পাশেই শায়িত হলেন করোনায় মৃত্যুবরণ করা প্রথম চিকিৎসক ডা. মঈন উদ্দিন। মারা যাওয়ার আগে শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার মরদেহ সুনামগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত কিছুদিন ধরে সারাবিশ্বে মৃত্যূর মিছিল দেখে আতঙ্কিতের পাশাপাশি মানসিকভাবে যেমন অনেকটা কষ্টে আছি তেমনি লাশের মিছিল দেখে চোখের পানিও রাখতে পারছিনা। মূত্যূ তো কখনো বলে কয়ে আসেনা। কিন্তু কখনো কখনো মৃত্যূ, পরিবারের সাথে সাথে সমাজ, জাতিকে কাঁদায়; হয়তো অনেকের কাছে প্রশ্ন উঠতে পারে এতো মৃত্যূর মিছিলের মধ্যে ডা. মঈনকে নিয়ে লেখার কি খুবই প্রয়োজন ছিল? আমি বলবো, মৃত্যূ যখন কোন সময় আসবে বলে কয়ে আসেনা, তেমনি কখনো কখনো বৃহত্তর স্বার্থের মধ্যে ক্ষুদ্র স্বার্থও অতি প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যদিও মৃত্যূ কোন ক্ষুদ্র বিষয় নয় যেমনটা ডা.মঈনের বেলায়ও। কেন চোখ সজল হয়ে আসছে বারবার? কেন আমি কেঁদেই চলেছি? মঈনউদ্দিন তো আমার কেউ না। বা মঈনের ছয় বছরের শিশু কন্যাওতো আমারনেয়। তাহলে কেন এতো কান্না? ডা. মঈনের ছয় বছরের শিশু তার চিকিৎসক বাবার কাছে আবেগঘন চিঠি লিখেছে। চিঠিতে করোনাভাইরাসকে মেরে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাবাকে বাসায় ফিরতে বলেছে সে। গত ২২ মার্চ থেকে এই চিকিৎসক তাঁর একমাত্র মেয়ে ও পরিবারের অন্যদের থেকে দূরে থাকছেন। এদিনের পর তিনি কর্মস্থল গাজীপুর থেকে আর বাসায় ফেরেননি। তিনি গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত। ওই শিশুর নিজ হাতে লেখা চিঠিটি দেখে আমি বিশ্মিত, হতভাগ এবং চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।

কি সুন্দর করে ছোট্ট হাতে এতো বড় একটি চিঠি লিখেছে যা ব্যাখা দিতে গেলে কয়েক পৃষ্ঠা লেখা হয়ে যাবে। ওই শিশু যখন বাবার কাছে চিঠিটি লিখছিল তখন ও জানতো ওর বাবা আর ফিরে আসবেনা? ফিরে এসে আগের মতো আর আদর করবেনা, আদর করে আর কোলে নিবেনা, বাসার দরজায় আসা মাত্রই মামনি বলে ডাকবেনা, বাসায় ঢুকার পরে যেভাবেই হোক লুঙ্গি বাবার হাতে দিবেনা। বাসায় এসে কলবেলে চাপ দিলে বাবার জন্য দরজা খুলবেনা, শুধু ডা. মঈনের মেয়ে কেন আমিও এক কন্যা সন্তানের বাবা। প্রায় সব বাবার সঙ্গেই সন্তানের এমন সম্পর্ক থাকে। বাবাকে আর শাসন করতে পারবেনা। বাবাকে আর বোকা ছেলে বলে ডাকবেনা। করোনাকে মেরে দিয়ে নয়, নিজেই মরে গেলেন। জীবিত অবস্থায় কর্মস্থলে গেলেও ফিরে এলেন নিথর দেহ। করোনাকে ঢিসুম ঢিসুম নয়, অবুঝ শিশুটি তার বাবাকে আর ঢিসুম ঢিসুম দিতে পারবেনা। অবুঝ শিশুটি আসলে বুঝে তার বাবাকে চিঠি লিখেছিলেন? অবুঝ সন্তানের সামনে পিতার লাশ বড় কষ্টের;

আগেই বলেছি মৃত্যূ এটি প্রকৃতির নিয়ম। জন্ম একবার হলে মৃত্যূ হতেই হবে। ডা. মঈনও সেভাবেই চলে গেছেন মহামারি করোনা ভাইরাসের কড়াল গ্রাসের ছোবলে। ডা.মঈনউদ্দিন এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে। কিন্তু ছোট্ট অবুঝ শিশুটির নিজ হাতের লেখা আমাদেরকে কাদিয়েছে। হতবাক করে দিয়েছে গোটা জাতিকে। ছোট্ট মামনি তোমাকে হয়তো বাবার মতো আদর-সোহাগ ভালোবাসা দিতে পারবোনা, তোমার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারবোনা। কিন্তু অন্তত তোমার এমন চিঠি লেখা নিয়ে আমার লেখাটি লিখে তোমার শোকের সাথে সামিল হলাম। তোমাকেসহ তোমার পরিবারের সকল সদস্যদের মহান সৃষ্টিকর্তা ধৈর্য্য দান করবেন এবং ভবিষ্যত শান্তি দিবেন এই দোয়া করি।

পরিশেষে বলতে চাই, কথায় বলে স্বাধীনতা করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। যে কোন বিষয় অর্জনের পাশাপাশি রক্ষা করাও কঠিন। একজন চিকিৎসকের চিকিৎসা নিয়ে রোগি সুস্থ্য হয়ে ওঠে, কিন্তু একজন চিকিৎসক যদি রোগি হয়ে পড়ে তাহলে চিকিৎসা করবে কে? এ জন্য প্রত্যেকের রোগ থেকে এড়াতে চাইলে সচেতনতা যেমন জরুরী তেমনি চিকিৎসকদের সুরক্ষাও জরুরী। এখন সময় এসেছে চিকিৎসকদের সুরক্ষার। সরকারি বা বেসরকারিভাবে চিকিৎসকদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেয়া। তা নাহলে শুধু করোনা নয়, কোন রোগ থেকেই চিকিৎসক নিরাপদ নয়। আগে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার প্রয়োজন। তাই আসুন ডা. মঈনের মৃত্যূ দিয়েই চিকিৎসকদের সুরক্ষার আন্দোলন সুচনা হোক।

লেখক :সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক। ইমেইল : msi.khokonp@gmail.com

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ