করোনা আক্রান্তদের সাথে এ কেমন আচরণ!

প্রকাশিতঃ ১২:৪৮ অপরাহ্ণ, সোম, ১ জুন ২০

এম.পলাশ শরীফ, বাগেরহাট : করোনা হওয়া কি কোন পাপ না অভিশাপ? রোগ তো কেউ ইচ্ছা করে আনে না। যেকোন রোগ-শোক দেওয়া ও নেওয়ার মালিক আল্লাহ। সেক্ষেত্রে আমাদের অপরাধ কি? করোনায় আমাদের মতো গরীব মানুষেরা অক্রান্ত হলে যদি দোষের হয়, তাহলে দেশে মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ-সাংবাদিকসহ বড় বড় ধনাট্য ব্যাক্তিরা আক্রান্ত হচ্ছেন কেন? আমরা অসুস্থ হওয়ায় যদি কারো ক্ষতি হয় তাহলে আমাদের মেরে ফেলা হোক। আমাদের সাথে কেন এমন আচরণ? ক্ষোভের সাথে এমন কথা জানালেন, বাগেরহাটের শরণখোলায় করোনায় আক্রান্ত কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।

উপজেলার খাদা গ্রামের বাসিন্দা মৃত সুলতান তালুকদারের ছেলে টেইলার্স ব্যাবসায়ী মো. সুমন তালুকদার বলেন, আমি গত ২২ মে ঢাকা থেকে পরিবারের ৮জন সদস্যকে নিয়ে রাজাপুর এলাকার আমার এক নিকট আত্মীয় এর একটি পরিত্যাক্ত বাড়িতে উঠি। আমাদের দেখে স্থানীয়রা বিষয়টি শরণখোলা থানা পুলিশকে অবহিত করেন।

খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাড়িতে এসে আমাদেরকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেন। পরে আবার ধানসাগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মঈনুল হোসেন টিপু বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবহিত করেন এবং ২৬ মে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফরিদা ইয়াসমিন আমার পরিবারের ৮ সদস্যের করোনা টেষ্টের নমুনা সংগ্রহ করেন। এতে আমার স্ত্রী শাহিনুর বেগম (২৭) শ্যালক জাহিদুল ইসলাম (১৮) এবং জাহিদুলের ভাবী মুক্তা বেগম (১৯) এর করোনা পজেটিভ বলে ২৯ মে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন।

এ খবর এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয় কতিপয় বখাটের নেতৃত্বে আমাকেসহ আমার পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন তারা। পাশাপাশি নানান ভয়ভীতি, অশ্লীল ভাষায় গালমন্দসহ শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করে কয়েক হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় ওই চক্র। বখাটেদের তোপের মুখে পড়ে আমি চরমভাবে লাঞ্চিত হওয়ার পর বাধ্য হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ফোন করি। পরে ইউএনও আমাদের উদ্বার করে ৩০মে উপজেলা সদরের রায়েন্দা পাইলট হাইস্কুলের স্বাস্থ্য বিভাগের অস্থায়ী আইসোলেশন সেন্টারে রাখেন।

শরণখোলা উপজেলার প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী ব্যাবসায়ী আ. হাকিম হাওলাদার বলেন, এই রোগ আমার শরীরে ধরা পড়লে অতি উৎসাহিত কিছু লোক ফেসবুকে আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য শুরু করেন। এমনকি প্রসাশনের বরাদ দিয়ে আমার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের নামসহ আমার নামে উপজেলা জুড়ে মাইকিং করা হয়। যা স্বাস্থ্য নীতির পরিপহ্নী। আমাকেসহ আমার পরিবারকে যে ধরনের অপমান করা হয়েছে তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। এমনকি আমি করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় বাজার কমিটির সাবেক এক সদস্যের নেতৃত্বে স্থানীয় কিছু উশৃঙ্খল ব্যাক্তি কয়েকদিন আগে আমার বাসায় হামলা চালায় ওই সময় আমার স্ত্রী -পুত্রকে মারধর করেন তারা। বিষয়টি থানায় জানালেও কিছু হয়নি।

এ ব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক আজমল হোসেন মুক্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ইতোমধ্যে বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ আর্থিক সহযোগীতার ব্যাবস্থা করেছেন। তবে শরনখোলায় করোনায় আক্রান্তদের সার্বিকভাবে সহয়তা করার জন্য প্রত্যেক ওয়ার্ডে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা আক্রান্ত ব্যাক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে খারাপ আচারণ করেছেন তারা দলের কেউ নয় বলে জানান।

রায়েন্দা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) হাদীসের বর্ণনা মতে একজন মুসলমানের উপর আরেক মুসলমানের ৬টি হক রয়েছে। তার মধ্যে কোন অসুস্থ ব্যাক্তিকে দেখতে যাওয়া তার খোঁজ খরব নেওয়া, তার চিকিৎসায় সহযোগতা করা, পারলে তাকে কোন হাদিয়া দেওয়া অন্যতম। কোন অসুস্থ ব্যাক্তিকে যদি কেউ অহেতুক কষ্ট দেয় এমনকি তার দিকে বাঁকা চোখে তাঁকায় তার উপর আল্লাহ সুবাহানা তালা লানদ দেন। অন্যায়ভাবে কোন মানুষকে কষ্ট দেওয়াটা ইসলাম সমর্থন করে না ।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্থফা শাহিন বলেন, আক্রান্ত ব্যাক্তিদের কেউ কোনভাবে হয়রানির চেষ্টা করলে সে যেই হোক না কেন ? তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এছাড়া বাগেরহাট জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ হুমায়ুন কবির জানান, আক্রান্ত ব্যাক্তিদের সাথে কেউ কোন অসাদাচারন করতে পারবেন না। এমনটা হয়ে থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখ জনক । সবাই মিলে অসুস্থ ব্যাক্তির সাথে ভাল ব্যাবহার করার পাশাপাশি তাকে সাহস দিতে হবে। কারণ তার যেন মনোবল ভেঙ্গে না পড়ে । আজ যারা করোনায় আক্রান্তদের সাথে খারাপ আচারণ করছেন আগামীদিন যে তারা আক্রান্ত হবেন না তার নিশ্চিয়তা কি। তবে এ বিষয়ে শীঘ্রই জনসাধারনকে সচেতন করার লক্ষ্যে পাড়া মহল্লায় প্রচার-প্রচারনার উদ্বেগ নেওয়া হবে।

সময় জার্নাল/

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।