কাশেম সোলাইমানির হত্যা ও মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা

প্রকাশিতঃ ২:০৭ অপরাহ্ণ, রবি, ৫ জানুয়ারি ২০

মাসুম খলিলী :

২০২০ সালের প্রারম্ভিক উত্তেজনাকর আগুনে নতুন করে ঘি ঢালার কাজটি করা হলো ইরানের দুই নাম্বার ক্ষমতাধর প্রধান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকান গার্ড বাহিনী আল কুদস প্রধান জেনারেল কাশেম সোলাইমানির হত্যার মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটানোর মধ্য দিয়ে নিজের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছিলেন বলে মনে হয়। তবে ঘটনাটির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের সে লক্ষ্য অর্জিত হবে কিনা সংশয় রয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেস এর অনুমোদন ছাড়া এধরনের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেক্রোক্রাট দলের নেতা ও প্রতিনিধি সভার স্পীকার ন্যান্সি। তিনি বলেছেন, এর মাধ্যমে অগ্নিকুন্ডুলিতে ডিনামাইট মারার কাজটি হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে এবং সেখানে কর্তব্যরত আমেরিকানরা আরো অনিরাপদ হয়ে পড়বেন।

রিপাবলিকানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেউ ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। অন্যদিকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। এর কেবল উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো ইসরাইল ও এর অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

কাশেম সোলাইমানির মৃত্যু ইরানের জন্য নিঃসন্দেহে অনেক বড় ক্ষতি। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়া নেটওয়ার্ক নির্মাণে তার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বিশেষত সিরিয়ার আসাদের শাসনকে টিকিয়ে রাখা, লেবাননে হিজবুল্লাহকে একটি দুর্দমনীয় ধরনের বাহিনীতে রূপান্তর, ইয়ামেনে আনসারুল্লাহ বাহিনীকে (হাউছি) সংগঠিত করা ও শক্তি যোগানোতে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছেন সোলাইমানি। এই ভূমিকার জন্য সোলাইমানি একটি সেনা বাহিনীর অভিজাত শাখার প্রধান হলেও তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব ছিল অনেক বেশি। প্রেসিডেন্ট রুহানির মেয়াদ শেষ হবার পর তাকে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থি হিসাবেও বিবেচনা করা হচ্ছিল।

এই অবস্থায় সোলায়মানির হত্যাকান্ড ইরানের জন্য নি:সন্দেহে একটি বড় আঘাত। কিন্তু এই ঘটনার পর দেশটিতে যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে সেটি ইরানের অর্থনৈতিক দুর্দশাসহ বিভিন্ন কারণে যে ক্ষোভ অসন্তোষ জনগণের মধ্যে ছিল সেটিকে কাটিয়ে উঠতে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে হচ্ছে।
একইসাথে এই ঘটনার অনেক বড় প্রভাব পড়বে ইরাকেও। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন শুধু তাই নয়, দেশটিতে সরকার গঠন নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে সেটির অবসান ঘটবে বলে মনে হচ্ছে এখন। মোকতাদা সদরসহ যারা ইরান প্রভাবিত ইরাক সরকার গঠনের বিরোধিতা করে আসছিলেন তারা আমেরিকান হামলার পর অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। এতে মনে হচ্ছে, সোলাইমানির হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে ইরানের শাসন পরিবর্তনে আমেরিকা-ইসরাইলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন অনেকটাই দুরুহ হয়ে পড়বে। অন্যদিকে ইরাকে ইরানি প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আবারো বাড়তে থাকবে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনি সোলাইমানি হত্যার জন্য দায়ীদের উপর প্রতিশোধ বা পাল্টা আঘাত হানার কথা বলেছেন। ইরান কিভাবে কত দ্রুত সে ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এর আগে রাশিয়া ও চীনের সাথে বিশেষ কোন বোঝাপড়ার চেষ্টা করতে পারে তেহরান। এই দুই দেশের সাথে এর মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে ইরান।

প্রশ্ন হলো ইরান মার্কিন হামলার জবাব কিভাবে দেবে? ইরানের ইসলামি বিপ্লবি গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র অন্যতম কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফাজল শেকারচি বলেছেন, কুদস ব্রিগেডের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার জন্য আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে। তবে এজন্য তাড়াহুড়ো করবে না ইরান। তিনি বলেন, আমেরিকাকে কঠোর জবাব দেয়ার জন্য ইরান ধৈর্য ধরে পরিকল্পনা করবে এবং উপযুক্ত সময় ও স্থান নির্ধারণ করেই জবাব দেবে। আইআরজিসি’র এ কমান্ডার আরো বলেছেন, তেহরান প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা প্রতিরোধের অক্ষশক্তিকে সর্বশক্তি নিয়োগ করে রক্ষা করবে।

এর আগে কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এ ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে জরুরি বৈঠক করেছে। পরিষদের বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমেরিকার এটা জেনে রাখা উচিত, এতবড় অপরাধযজ্ঞ চালিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় তারা সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল করেছে এবং এত সহজে তারা এই ভুলের পরিণতি থেকে রেহাই পাবে না।” উপযুক্ত সময়ে ও উপযুক্ত স্থানে আমেরিকার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধ নেয়া হবে বলে জানিয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরাকের সাম্প্রতিক গোলযোগে ইরানের হাত থাকার মার্কিন অভিযোগ ও ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের হুমকির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধের পথে হাঁটছে না কিন্তু কেউ যদি আমাদের স্বার্থ, সম্মান ও উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে কোনো বিচার বিবেচনা ছাড়াই কঠোরভাবে তাদের মোকাবেলা করা হবে।

ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেয়া এসব বক্তব্যে মনে হয় না যে, খুব তাড়াহুড়া করে দেশটি প্রতিশোধের পথে পা বাড়াবে। বরং তারা যা কিছু করবে তা করা হবে ভেবে চিন্তে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নেবার আগে ইরানের কার্যক্রমের উপর নজর রাখবে। আমেরিকান সংবিধান অনুসারে কোন দেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। ইরানের পাল্টা আঘাত এবং তার পরিণতিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাতে মার্কিন সম্পৃক্ততার জন্য ট্রাম্পকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।

ইরানি রিপাবলিকান গার্ড প্রধানের হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়া যেভাবে প্রতিনিধি সভা ব্যক্ত করেছে তাতে এই ধরনের অনুমোদন পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন হতে পারে। এছাড়া আমেরিকান প্রশাসন বা দেশটির ‘ডিপ স্টেট’ যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে চান বলে মনে হয় না। ইরানের সাথে সংঘাতে সৌদি-আমিরাত বলয় ও ইসরাইলকে সামনে রেখে ভূমিকা রাখার বিষয়টি মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক নীতির সাথে মিলে। কিন্তু সোলাইমানির হত্যাকান্ডে ইসরাইলের গোয়েন্দা সহায়তার কথা বলা হলেও এই অপারেশন প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র চালিয়েছে। এটাকে সামনে রেখে ইরান পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকি নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এর মধ্যে বাড়তি বেশ কিছু সেনা ট্রাম্প প্রশাসন উক্ত এলাকায় পাঠিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনের বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈরি পরিবেশে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি কতটা নিয়ে ইসরাইল এবং সৌদি-আমিরাতকে খুশি করবেন সেটি বিবেচনার বিষয়।

মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় রশিয়াকে কোনভাবেই হিসাব নিকাশের বাইরে রাখা যাবে না। দেশটি বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় রাখার জন্য যে ধরনের ঝুঁকি নিয়েছে তার চেয়ে বেশি ঝুঁকি নিতে পারে তেহরানের ইস্যুতে। এর কারণ ইরান হলো এই অঞ্চলের রাশিয়ার সবচেয়ে বড় মিত্র। যুক্তরাষ্ট্র এখানে ইরানের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হলে রাশিয়া অনেকখানি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এর সহায়ক অংশ হয়ে যেতে পারে।

আর ইরানও চাইবে না যুদ্ধকে তার নিজ ভূখণ্ডে নিয়ে আসতে। ফলে ধারণা করা যায় যে, ইরান প্রতিশোধ গ্রহণের কাজটি প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে নেবার চেষ্টা করবে। আর সেক্ষেত্রে যতটা না যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য হবে তার চেয়ে বেশি হতে পারে ইসরাইল। আর ট্রাম্প প্রশাসনও ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে প্রক্সি শক্তিগুলোর উপর আঘাত চালানোর বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করতে পারে।

প্রশ্ন হলো ইরান কীভাবে প্রতিশোধ নেবে? এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যায়। ইয়েনি সাফাক পত্রিকার সম্পাদক ইব্রাহিম কারাগুলের মতে, ইরান কখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করবে না। এখন যে সংকট বা উত্তেজনা তা পারস্পরিক হুমকির বাইরে যাবে না। তার পর্যবেক্ষণ অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল সিরিয়া ও ইরাকে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে যখন আঘাত করছিল তখনও তেহরান কোনও সাড়া দেয়নি। তিনি ট্রাম্পের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেন। যেখানে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরান কখনই যুদ্ধে জিতেনি, তবে এটি কখনও কোনও আলোচনায় পরাজিত হয়নি।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্যে এই ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে যে আলোচনার সময় শেষ হয়ে গেছে।

ইরান যে ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ নেবার কথা বলেছে, তাতে মনে হয়, সোলাইমানির হত্যার প্রতিশোধ কার্যক্রম ইরাকের মাটিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান তাদের প্রভাবের জন্য যুদ্ধকে ইরাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আসলে এটি ইরান এবং সৌদি আরবের মধ্যে সংঘটিত হতে চলেছে। ইরাক-সৌদি আরবের শক্তির যে লড়াই ইরাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে, তা আরও বড় হতে চলেছে।

সম্ভবত ইরান সরাসরি লড়াইয়ে নামবে না। দেশটি প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে পরোক্ষ উপায়ে মার্কিন পদক্ষেপের সাড়া দেবে। এটি তার ছায়া সহযোগি শক্তির মাধ্যমে পরোক্ষ উপায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলিকে আঘাত করতে পারে। ‘হাউছি ক্ষেপণাস্ত্র’ সৌদি অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ সুবিধা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বা দুবাইয়ের উপর পড়তে পারে। ইরান আফগানিস্তান থেকে লেবানন পর্যন্ত যেকোন জায়গায় এই ছায়া শক্তি ব্যবহার করতে পারে।

এক পর্যায়ে যুদ্ধ ও শোডাউন ইরাকের সীমানা ছাড়িয়ে উপসাগরে তীব্র হতে পারে। এর অর্থ হবে ইরান-সৌদি সংঘর্ষ। একই সাথে এর অর্থ হবে পারস্য উপসাগরে হুমকি ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সম্ভবত আরো জটিল হবে।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ