দর্জি মনির হোসেন হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা

প্রকাশিতঃ ২:২৪ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০

সময় জার্নাল ডেস্ক :

মনির হোসেন। বয়স চল্লিশ বছর। পেশায় দর্জি। উত্তরা ১১ নং সেক্টরের ১৭ নং রোডে ‘সততা স্কুল ড্রেস এন্ড টেইলার্স’ এ দর্জি হিসেবে কাজ করে। আশুলিয়া থানাধীন জিরাবো এলাকায় স্ত্রী হ্যাপি, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে এক রুমের ভাড়া বাসায় থাকে। ছেলে আরিফের বয়স বারো বছর। মেয়ে মরিয়মের বয়স সাড়ে তিন। আরিফ বাসার পাশেই একটি স্কুলে পড়ে।

গাইবান্ধা সদরের উত্তর গিদারী গ্রামে জন্ম মনির হোসেনের। ঢাকায় এসেছে দুই বছর আগে। উত্তরার ‘সততা স্কুল ড্রেস এন্ড টেইলার্স’ সে কাজ শুরু করেছে তিন মাস হলো। কম ভাড়ায় বাসা পাওয়া যায় বলে দূরে হলেও জিরাবোতে থাকে। কাজ শেষে রাত সাড়ে নয়টা থেকে দশটার মধ্যেই বাসায় ফেরে মনির।

সংসারে অভাব থাকলেও বেশ ভালোই কাটছিল তাদের দিন।

৩ জানুয়ারি’২০২০ রাত নয়টার দিকে মনির স্ত্রী হ্যাপিকে মোবাইল ফোনে জানায়, ‘কাজের চাপ আছে। বাসায় ফিরতে দেরি হবে’।

স্বামীর জন্য অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ে হ্যাপি। ভোর ছয়টার দিকে ঘুম ভাঙ্গে হ্যাপির। মনির বাসায় ফেরে নি তখনো। মোবাইল নম্বর বন্ধ। আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের ফোন করা হয়। মনিরের কোন সন্ধান নেই। দুপুর বারোটার দিকে স্বামীর কর্মস্থল ‘সততা স্কুল ড্রেস এন্ড টেইলার্স’ এ গিয়ে হ্যাপি জানতে পারে রাত এগারোটার দিকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে মনির।

আশেপাশের পুরো এলাকা খোজা হলো। টেইলার্স মালিকের উদ্যোগে মাইকিং করা হলো। মনিরের কোন সন্ধান নেই।
বিধ্বস্ত হ্যাপি জিডি করতে উত্তরা পশ্চিম থানায় যায়। থানায় টানানো দৈনিক পত্রিকায় শিরোনামে চোখ আটকে যায় তার ‘খিলক্ষেত থানাধীন কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের উপর অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার’।

খিলক্ষেত থানায় যোগাযোগ করা হয়। জানা যায় ৪ জানুয়ারি’ ২০২০ রাত অনুমান ০১.৩০ ঘটিকায় কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারে অজ্ঞাত একজন পুরুষের লাশ পাওয়া গেছে। ময়না তদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

মর্গে মনিরের লাশ সনাক্ত করে হ্যাপি।

গত ০৫ জানুয়ারি’ ২০২০ দিবাগত রাত ০১.৩৫ ঘটিকায় তেজগাঁও বিভাগের হাতিরঝিল থানাধীন মগবাজার ফ্লাইওভারের উপরে সোনারগাঁও প্রান্তে রেলক্রসিং বরাবর মিজানুর রহমান নামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির একজন ছাত্রের লাশ পাওয়া যায়। ঠোঁটে একছোপ রক্ত ছাড়া যার সারা শরীরে কোন আঘাতের চিহৃ পাওয়া যায় নি। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের এডিসি হাফিজ আল ফারুক, এসি মঈনুল ইসলাম, হাতিরঝিল থানার ইন্সপেক্টর মহিউদ্দীন ফারুক, এসআই মবিন, এসআই খায়রুল এএসআই তরিকের একটি টীম ২৩ জানুয়ারি’ ২০২০ রাত ০৮.২৫ ঘটিকায় টঙ্গী এলাকা থেকে নুরুল ইসলাম এবং ২৫ জানুয়ারি’ ২০২০ গাজীপুরা ও তুরাগ এলাকা থেকে আবদুল্লাহ বাবু ও জালালকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃত নুরুল ইসলাম মূলত সিএনজি চালক। সিএনজি চালনার আড়ালে তার মূল পেশা ছিনতাই। নুরুল ইসলামসহ আরো আটজন মিলে তারা গড়ে তুলেছে সিএনজি কেন্দ্রীক দুটি ভয়ংকর ‘ছিনতাই ও কিলিং’ গ্রুপ। রাত আটটার পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত আশুলিয়া, আবদুল্লাহপুর, উত্তরা, গুলশান, ভাটারা, খিলক্ষেত, বাডডা, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, রামপুরা, ৩০০ ফিট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ি, সাইনবোর্ড এলাকায় সিএনজিতে যাত্রী উঠিয়ে চলতে থাকে তাদের অপকর্ম।

গ্রেফতারকৃত নুরুল ইসলাম জানিয়েছে, সে গত ৫-৬ মাসে প্রায় ৬০০ ছিনতাই করেছে। তার সহযোগী ৫-৬ জন আছে যারা প্রায় ৩-৪ বছর ধরে ছিনতাই করছে। অনেকেই ২০০০-২৫০০ ছিনতাই করেছে। রাত আটটায় বের হয়ে সূর্যোদয় পর্যন্ত কমপক্ষে একটি থেকে সর্বোচ্চ ছয়টি পর্যন্ত ছিনতাই করার রেকর্ড আছে।

বাস স্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, বাজারগামী লোকজন বা যেকোন পথচারী তাদের টার্গেট। ‘টার্গেট ব্যক্তি’র পাশে সিএনজি থামিয়ে তার গন্তব্য জানতে চায় নূরুল ইসলাম। ‘টার্গেট ব্যক্তি’ যে গন্তব্যই বলুক না কেন সে পিছনের সিটে যাত্রী হিসেবে বসা তার দুজন সহযোগীকে গন্তব্য জিজ্ঞেস করলে তারাও টার্গেট ব্যক্তির গন্তব্য বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকার কথা বলে।

টার্গেট ব্যক্তি সিএনজিতে উঠলে কৌশলে তাকে মাঝে বসানো হয়। অনেক সময় মাঝের সিটে বসতে রাজি না হলে পিছনে বসা দুই ছিনতাইকারী শাহিন ও নাজমুলের একজন বমির ভান করে বা অন্য কোন অজুহাতে টার্গেট ব্যক্তি মাঝের সিটে বসায়।

সিএনজি নির্জন স্থানে পৌছামাত্র সিএনজি চালক নুরুল ইসলাম মাথা চুলকিয়ে বা অন্য কোন স্টাইলে পিছনে বসা দুজনকে ইশারা করে। তাৎক্ষনিকভাবে শাহীন টার্গেটের পিঠে শক্ত করে আঙ্গুল উচিয়ে ধরে জানায়, ‘আমরা ছিনতাইকারী। যা আছে দিয়ে দে। তা না হলে প্রাণে মেরে ফেলবো’। বিনা বাধায় টাকা, পয়সা, মোবাইল ও মূল্যবান মালামাল দিয়ে দিলে তাকে সুবিধাজনক স্থানে সিএনজি থেকে নামিয়ে দেয়। তবে কেউ দিতে না চাইলে, বাঁধা দিলে বা চিৎকার করলে টার্গেট ব্যক্তির দুপাশে বসা শাহিন ও নাজমুলের একজন শক্ত করে তার হাত ধরে এবং অন্যজন গলায় গামছা পেচিয়ে ধরে শক্ত করে। এতে কেউ মারা গেলে তার মৃতদেহ সিএনজি থেকে নামিয়ে ফেলা হয় ফ্লাইওভারের উপর বা নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে।

৩ জানুয়ারি’ ২০২০ রাত সাড়ে এগারোটার দিকে মনিরকে উত্তরা এলাকা থেকে যাত্রী হিসেবে সিএনজিতে উঠানো হয়। মনির জিরাবোতে যেতে চেয়েছিল। সে বামে বসলেও তাকে কৌশলে মাঝখানে বসানো হয়। সিএনজি নির্জনস্থানে পৌছামাত্রই নূরুল ইসলাম মাথা চুলকিয়ে ইশারা করে। পিছনে বসা শাহিন আজাদের পিঠে আঙ্গুল তাক করে তার কাছে যা আছে সব দিয়ে দিতে বলে। মনির টাকা ও নষ্ট মোবাইলটি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সিএনজি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করে। নাজমুল শক্ত করে তার হাত ধরে রাখে এবং শাহিন তার গলায় শক্ত করে গামছা পেচিয়ে ধরে। ক্ষনিক পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আজাদ। রাত সোয়া একটার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারে মনিরের লাশ ফেলে দেয় নুরুল ইসলাম, শাহীন ও নাজমুল।

গ্রেফতারকৃত নুরুল ইসলাম জানিয়েছে, সিএনজি ভাড়া ও ছিনতাইকৃত টাকার ভাগ পাওয়ার শর্তে নিয়মিতভাবে গোলাম মোস্তফা জীবন সিএনজিটি ছিনতাইকারীদেরকে সরবরাহ করতো।

২৯ জানুয়ারি’ ২০২০ দিবাগত রাত ১২.৪০ ঘটিকায় তুরাগ থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় গোলাম মোস্তফা জীবনকে। জিজ্ঞাসাবাদে গোলাম মোস্তফা জীবন জানায়, ‘মধ্যরাতে নাজমুল ও শাহীন তার কাছ থেকে সিএনজি নিয়ে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে। তারা খিলক্ষেতের ডুমনি আহবপাড়া সংলগ্ন ৩০০ ফিট সড়ক ও ফায়ার সার্ভিসের মাঝামাঝি স্থান অতিক্রম করছিল। রাত পৌনে চারটার দিকে হাতিরঝিল থানা পুলিশের নিরাপত্তা চৌকির মুখোমুখি হওয়ামাত্র তারা সিএনজি থামিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আত্নরক্ষার্থে হাতিরঝিল থানা পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে দুপক্ষের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে নাজমুল ও শাহীন গুলিবিদ্ধ হয়। আহত নাজমুল ও শাহীনকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষনা করেন। ছিনতাইকারীদের গুলিতে চার পুলিশ সদস্য আহত হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে নূরুল ইসলাম, জালাল, আবদুল্লাহ বাবু ও গোলাম মোস্তফা জীবন যে তথ্য দিয়েছে তা রীতিমতো লোমহর্ষক।

১০ ডিসেম্বর’ ২০১৯ থেকে ৬ জানুয়ারী’ ২০২০। রাজধানীর ভিন্ন ভিন্ন ফ্লাইওভারে পাওয়া গেছে চারটি লাশ। প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের ধরন একই রকম। সবার গলায় গামছা বা মাফলার পেচিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত ১০ ডিসেম্বর আক্তার হোসেন নামের এক স্বর্নকারকে হত্যার পর লাশ ফেলে রাখা হয় কুড়িল ফ্লাইওভারে। ৩১ ডিসেম্বর খিলক্ষেত ফ্লাইওভারে উঠার পথের ডানপাশে আজাদ নামের এক ঝাল মুড়ি বিক্রেতার লাশ পাওয়া যায়। ৪ জানুয়ারি’ ২০২০ কুড়িল বিশ্বরোড সংলগ্ন ফ্লাইওভারে মনির হোসেনের লাশ পাওয়া যায়। সর্বশেষ ৬ জানুয়ারি মগবাজার ফ্লাইওভারের উপরে সোনারগাঁও প্রান্তে রেলক্রসিং বরাবর লাশ পাওয়া যায় মিজানুর রহমানের।

গ্রেফতারকৃত নূরুল ইসলাম ও তার সহযোগী দুই ছিনতাইকারী শাহিন ও নাজমুল উল্লেখিত চারটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারাক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে নূরুল ইসলাম। মূলত: সিএনজিতে যাত্রী হিসেবে উঠিয়ে ছিনতাইয়ে বাঁধা দেওয়ায় বা আত্নরক্ষায় চিৎকার করায় তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অধিক্ষেত্রের বাইরে দুটি এলাকায় গত দুই মাসে আরো ৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে নূরুল ইসলাম স্বীকার করেছে। পাশাপাশি ছিনতাইয়ের পর অজ্ঞান বা অর্ধমৃত অবস্থায় ৩০-৪০ জন জন যাত্রীকে বিভিন্ন ফ্লাইওভার বা নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে সিএনজি থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে স্বীকার করেছে নূরুল ইসলাম। এদের মধ্যে ৮-১০ জন বাস-ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেছে।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ