দু’চোখে উত্তরবঙ্গ

প্রকাশিতঃ ১২:৩১ অপরাহ্ণ, সোম, ৩০ নভেম্বর ২০

জুনাইদ আল হাবিব

লালমনিরহাট থেকে ঢাকা ফিরে এবারের গন্তব্য দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট। তবে সিলেটে যাবার আগেই এক নিকট আত্মীয়ের বিশেষ অনুরোধে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে নামতে হলো। দু’রাত একদিন কাটলো ভৈরবে। পড়ন্ত বিকেলে গেলাম ভৈরব মেঘনাপাড়ে।

এতদিন বাড়ির কাছে, নিজ গ্রামের পাশ দিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে বয়ে চলা যে হিংস্র মেঘনার সাথে পরিচিত ছিলাম, ভৈরবে গিয়ে মেঘনার শান্তশিষ্ট ভাব দেখে ভাবনাটা অন্যরকম হয়ে গেল। এখানে মেঘনা এত শান্ত! ভাবতেই অবাক হই। ভৈরব মেঘনাতীরের ওপাড়েই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ। নদীর ওপরেই দু’টি বড় বড় সেতু। রেলের একটি, সড়কপথের একটি সেতু। বিকেলের পুরোটা সময় কেটেছে মেঘনাতীরে। শহরের যান্ত্রিকতা ছেড়ে একটু শ্বাস ফেলার জন্য মানুষের ভিড় দেখা যায় সেখানে।

সকালেই রেলস্টেশন গিয়ে টিকেট কেটে এলাম সিলেটের। সকাল আটটায় ট্রেন। রাত গেল, সকাল হলে দ্রুত বেরিয়ে পড়ি। অপেক্ষার প্রহর শেষ, ট্রেন আসলো, ছাড়লো সিলেটের উদ্দেশ্যে। ট্রেন চললো রেলসেতু হয়ে। তারপর ব্রাহ্মণবাড়ির আশুগঞ্জ। কিছুদূর যেতেই দেখি, প্রকৃতির মুগ্ধকরা সৌন্দর্য। বিশাল বিশাল বিল। বিলের জলরাশি মনে যেন শীতলতা ছুঁয়ে দেয়। এর মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিদের ওড়াউড়ির দৃশ্য মনকে হারিয়ে নেয় অন্যজগতে।

ট্রেন থেকে দৃশ্যগুলো দেখতে পারলে যেন ভ্রমণের ক্লান্তিটা একদমই গাঁ ছুঁয়ে না। কখনো বিলের মাঝে বিস্তীর্ণ জলরাশি, কখনো দেখা মেলে বিলজুড়ে কৃষকের স্বপ্নের ফসল। কৃষক যেন মাঠে বিছিয়ে রেখেছে সবুজের গালিছা। মন ছুঁয়ে যায়। প্রকৃতি এবং ওখানকার মানুষের জীবন যেন একই সূত্রে মিশেল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পার হলেই হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ। ওখানের পথ-ঘাটগুলোর দিকে তাকানোর পর মাথায় আসে, ‘গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথ, আমার মন ভোলায়রে’ গানটি। আঁকাবাঁকা পথ বয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম, মাঠজুড়ে কৃষকের ফসল ফলানোর দৃশ্যটা নজর কাড়ে। শায়েস্তাগঞ্জের পরই মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় একটি স্থান একটি। ট্রেন যতই যাচ্ছে দেখা মেলে বিশাল চা বাগান আর ছোট বড় অসংখ্য পাহাড়। পাহাড়ের সাথে মিলেমিশে চায়ের উৎপাদন যেন অন্যরকম দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। পাহাড়ের পাদদেশে দেখা মেলে অসংখ্য হ্রদের।

পাহাড় ঘেঁষে ট্রেন চলতে চলতে ঘড়ির কাঁটায় তখন সময়টা ১টা। ট্রেন থামে সিলেট রেলস্টেশনে। সেখান থেকে চলে যাই উপশহর। পরদিন সকালে যাই পাহাড় আর নদীঘেরা জাফলং এ। বাংলাদেশ-ভারতের সীমন্ত ঘেঁষা এ স্থানটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। নদীর নীল শীতল জলরাশি, সাদা পাথর আর পাহাড়ের সৃষ্টিশীল প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে দুপুর গড়িয়ে ২টা।

গেইট লক সার্ভিসের যে বাস হয়ে উপশহরে ফেরা সে বাসেই ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যায়। বিকেলে ফ্রেশ হয়ে খেয়েদেয়ে যাই হযরত শাহজালাল (রঃ), হযরত শাহপরান (রঃ) এর মাজার, মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ। এরই মাঝে মাথায় আসে টাঙ্গুয়ার হাওর যে সুনামগঞ্জে। তো সিলেট থেকে সুনামগঞ্জের দূরত্ব বলতে পাশের জেলা। তাই পরদিনই সেখানে। জেলা শহরে শুক্রবারের জুমআবাদ বাইকযোগে চলছি হাওরের পথে।

সুনামগঞ্জে পা রাখতেই প্রকৃতির মুগ্ধতা দেখে বিমোহিত হই৷ যোগাযোগের পথ তেমনটা সুবিধার না। কিন্তু পাহাড়ের প্রকৃতি যেন সুনামগঞ্জের প্রকৃতিকে অপরূপ করে তুলেছে। পথেই প্রথমে যাই আলোচিত বিশাল শিমুল বাগানে, তারপর নিলাদ্রী, সেখান থেকে হাওরের পথে। যেতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পথে।

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হাওর হলেও হাওরের প্রকৃতি দেখতে নেই তেমন সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাস্তা-ঘাট যে এই কাঁচা, অসহনীয় দুর্ভোগে পড়তে হয় পর্যটকদের।

যাই হোক, অবশেষে হাওরের কাছে। একটি খেয়াতে করে হাওরের সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখার চেষ্টা। হাওর প্রকৃতি এতটাই সুন্দর যে, জার্নি করার সকল ক্লান্তি যেন নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। গোধূলির রঙ যেন মন ছুঁয়ে যায়। হাওর থেকে একসঙ্গে চাঁদ এবং সূর্য দেখার সুযোগ হয়েছে। এ দৃশ্যটা যেন অনন্য সুন্দর। হাওর ঘুরে ফিরে এলাম বাইকযোগে সুনামগঞ্জে। সেখান থেকে বাসযোগে সিলেট। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত, সময় ১২টা।

ঘুমিয়ে পড়লাম, সকাল হলে শ্রীমঙ্গলের চা বাগান দেখতে যাব, চায়ের পাতা ছুঁতে যাব। চা বাগান দেখা হলো, আট রঙের চাও খাওয়া হলো, দেখা হলো বিশাল রাবার বাগানও। বিকেল ৫টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে টিকেট কাটলাম বাসের।

বৃষ্টিদিনে ফিরে এলাম চা বাগান থেকে। বাসে চড়ে চললাম ঢাকার পথে। পথিমধ্যে সন্ধ্যার কিছু মনছোঁয়া দৃশ্যের দেখা। এভাবে চলতে চলতে রাত ১০টায় পা রাখি রাজধানীতে। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ ভ্রমণ হলো। সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশেষ শুকরিয়া, পুরোটা সময় সুস্থ-সবল রেখেছেন।

আরও পড়ুন : দু’চোখে উত্তরবঙ্গ

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।