দূঃসময়েই স্বজন চেনা যায় : মোল্লা জালাল

প্রকাশিতঃ ১:৫০ পূর্বাহ্ণ, রবি, ২৯ মার্চ ২০

মোল্লা জালালঃ ষাটোর্ধ বয়স। হার্টে বাইপাস করা। ডায়বেটিস বেশী, ফলে কিডনিও আক্রান্ত হচ্ছে। দু’পায়ে হাঁটুর নীচে ভাসকুলার ব্লক। য়ার ফলে হাঁটতে কিছুটা সমস্যা হয়। এসব কারণে খুবই নিয়মের মধ্য দিয়ে আমার দিন কাটে।খালি ও ভরা পেটে সুগার লেবেল দেখে নিয়মিত ইনস্যুলিন নেই।

২০১৩ সালে হার্টে বাইপাস করার পর নাগালের মধ্য প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখার জন্য একটি ওষুধের দোকান করেছি। সেগুনবাগিচায় যে ভবনে আমার ফ্ল্যাট তার নীচ তলায় দোকান। ওষুধসহ ভাড়া দিয়েছি। ডালিম নামের একটি ছেলে দোকান চালায়। দোকানে সব রকমের ওষুধই থাকে। তবে অগ্রাধিকার আমার গুলোর।

একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়মিত দোকানে বসেন। রোগী দেখেন। বাসায় আমার সার্বক্ষনিক সঙ্গী হচ্ছে ড্রাইভার মুনসুর। ওই সব দেখাশুনা করে। ঘরবাড়ি গুছানো, রান্না বান্না,কাপড় ধূয়া মুছা করাসহ ওষুধ খাওয়ানোর আলাদা লোক আছে। তিনজন নিয়মিত বাসায় থাকে আরেকজন ছুটা বূয়া প্রতিদিন সকালে এসে ভারি কাজগুলো করে সন্ধ্যায় চলে যায়। মুনসুর বাদে অন্য সবাই আমার স্ত্রী কর্তৃক নিয়োগকৃত। ওদের বেতন ভাতা, সুবিধা অসুবিধা, ছুটি ছাটা সব দেখার দায়িত্ব তার।

জরুরি কাজ না থাকলে সাধারনত আমি দুপুরের আগে কোথাও যাই না। প্রতিদিন বাসায় লাঞ্চ করি। বাইরে কখনো কোথাও কিছু খাই না। মাঝেমধ্যে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে ক্লাবে যাই, সহকর্মী বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই। কোনদিন বাজার ঘুরে দেখি। পছন্দের তাজা শাক-সবজি কিনি। বাইরে না গেলে বন্ধুরা বাসায় আসে গল্পে সল্পে সময় কাটে। ইউনিয়নের জরুরি কাজ বাসায় থেকেই করা হয়। এখানে সুবিধাটা হচ্ছে, প্রেসক্লাবের উল্টো পাশেই আমার বাসা। ফলে ছোটখাটো মিটিং, মতবিনিময়,চায়ের অাড্ডা সবকিছুতেই এখানে সুবিধা বেশী।

এভাবেই দিন যাচ্ছিলো। মাঝখানে গত জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি মাস ইন্ডিয়া দৌড়া দৌড়ি করতে হয়েছে। পায়ের ভাসকুলার অপারেশন করানোর জন্য। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ইন্ডিয়ায় অবস্থানকালে সেখানকার গণমাধ্যমে খবর পাই চীনে করোনা ভাইরাস বিস্তারের কথা। ইন্ডিয়ার এবিপি আনন্দ টিভি চ্যানেলে এবিষয়ে প্রায়ই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নিয়ে আলোচনা শুনতাম। ফলে ব্যাপক হারে সংক্রমন বিস্তারের আঁচ করতে পেরে চিকিৎসা স্থগিত রেখেই দেশে ফিরে আসি। ততদিনে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশেও আলোচনা শুরু হয়ে গেছে।

১০ মার্চ ডাক্তার আমাকে বাসা থেকে বের হতে বারণ করলেন। তার যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু আমার বয়স ষাটোর্ধ, ডায়াবেটিস বেশী, হার্টে বাইপাস,কিডনিতেও সমস্যা আছে, শ্বাসকষ্টের জন্য নিয়মিত ইনহেলার নিতে হয় সুতরাং করোনা ভাইরাস আমার জন্য খুবই বিপজ্জনক। অতএব আক্রান্ত না হলেও হোম কয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। প্রথমদিকে কয়েকদিন এভাবেই কেটে যায়। সকল মিডিয়ায় তখন প্রধান আলোচনা করোনা ভাইরাস নিয়ে। পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। যে যারমত করে ষ্ট্যাটাস দেয়া শুরু করে। ফলে সতর্কতার পাশাপাশি আতঙ্কও ছড়াতে থাকে। আতঙ্কের ধাক্কা এসে আমার হোম কয়ারেন্টিনেও লাগে। খুলানায় কর্মস্থল থেকে স্ত্রী আর কানাডা থেকে ছেলে আমাকে গৃহবন্দী করার জন্য প্রতিদিন নির্দেশ দিতে থাকে। ফলে এখন আমি বাসার একটি ঘরে সম্পূর্ণ আইসোলেটেড।

ঘরটিতে লাইট,ফ্যান, ইন্টারনেট, টিভি,মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট,কম্পিউটার সব কিছুই আছে। কলিং বেল টিপলেই কাজের লোক আসে, ফুট-ফরমায়েশ করে চলে যায়। কেউ আমার কাছে বেশীক্ষন থাকে না। ইদানীং ঘরটাকে আমার “কবরেরমত” মনে হয়। যদিও এই ঘরে যা আছে, তা কবরে নেই। এখানে আমার ভোর হয়, সকাল আসে দুপুর গড়ায়, বিকেল যায়। রাত গভীর থেকে গভীর হয়। ইন্টারনেটে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াই আর দেখি এই মহামারির ভয়াবহতা। একসময় চেখের পাতা ভারি হয় আমি বিছানায় যাই। ভাবনায় এক সুন্দর সকালের স্বপ্ন খেলা করে আর আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আবার সকাল আসে। শুরু হয় আমার ওষুধ থেরাপি। নিয়ম ধরে এগুলো করতে করতে ১০ টা সাড়ে ১০ বেজে যায়। এরই মাঝে খবরের কাগজ দেখা শেষ। কোন কাগজেই এমন কোন খবর নেই যা আগের রাতে টিভি, ইন্টারনেট বা ফেসবুকে আসেনি। সকাল দিকে টিভিতে তেমন কোন নতুন খবর কম থাকে বলে তখন আর টিভি দেখিনা। আবার গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। দুপুর ১২ টা ১টার দিকে ঘুম ভাংগে। প্রস্তুতি চলে গোসলের। গিজারে গরম জল, ধূয়ে রাখা কাপড় চোপড়, লোশন,সেম্পো সবই থাকে। গোসলে যাই, সাবান মেখে গোসল করি। পরে দুপুরের খাওয়া, বিশ্রাম, পয়চারি করা। বিকেলে চা নাস্তা। সন্ধ্যায় আবার টিভি-ফেসবুক আর ইন্টারনেটে সারা দুনিয়া ঘুরে দেখা।

মাঝেমধ্য ভাবি, কে আমাকে গৃহবন্দী করলো, কার হুকুমে…। ভিতর থেকে জবাব আসে ” মৃত্যু ভয়”। শুধু আমাকে নয়, গোটা বিশ্বের সবাইকে এককাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে যে শক্তি তার নাম “ভয়”। আর এ ভয়ের কারনেই
বিশ্ববাসী এখন নিয়ম মেনে চলছে। এ নিয়ম যার তার মনগড়া নিয়ম নয়, সরকারের নিয়ম। প্রত্যেক দেশের সরকার তার নাগরিকদের জন্য নিয়ম করে দিয়েছে। সকলেই ওই নিয়ম মেনেই চলছে।

এই মহাদূ্র্যোগ থেকে বাঁচতে হলে প্রত্যেককে নিয়ম মানতেই হবে। আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়েজিত ডাক্তার নার্স স্বস্থ্যকর্মী, নিয়ম রক্ষায় নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, তথ্য দেয়ায় সংবাদ কর্মী। এরা প্রত্যেকেই মানুষ। তাদেরও জীবন আছে। আছে স্ত্রী পুত্র কন্যা পরিবার পরিজন। তাদেরও সুরক্ষা প্রয়োজন। ভারতে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সরকার জনপ্রতি ৫০ লাখ টাকার বীমার প্যাকেজ দিয়েছে। গরীব মানুষদের বিনা মূল্যে ৩ মাস রেশন দিবে। আরো অনেক সামাজিক সুরক্ষার চিন্তাভাবনা চলছে। বাংলাদেশেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পোষাক শ্রমিকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনার সাথে সাথেই এক শ্রেণীর লুটেরা দৌড়া দৌড়ি শুরু করে দিয়েছে প্যাকেজ লুট করার জন্য। পাশাপাশি প্যাকেজ সুবিধা নেওয়ার জন্য একের পর এক দাবিদারও বাড়তে শুরু করেছে। সবাই হিসাবের খাতাপত্র খুলে বসছে, কার কত চাই…। অথচ এসব লুটেরা মালিকরা কেউই নিজেদের কর্মীদের জন্য কিছুই করছে না। তারা লাভ চায়, লাভের আশায় কারখানা বন্ধ করে না। বাজারে ক্রেতা নেই তবুও উৎপাদন দরকার।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহামারি ও আপৎকালে মাফিয়ারা অর্থ-সম্পদ গচ্ছিত করার জন্য মানুষের জীবনকে বাজি ধরে। এদের কোন দয়া মায়া নেই। এরা শুধু মুনাফা বুঝে। প্রধানমন্ত্রীর প্যাকেজের টাকা রাষ্ট্রের। এ টাকা শুধুমাত্র শ্রমিকদের জন্য,মালিক নামের লুটেরাদের জন্য নয়। সুতরাং এই প্যাকেজ যাতে লুট না হয় সেনাবাহিনীকে বলুন প্রতিটি চালু গার্মেন্টসে গিয়ে নিজেদের হাতে প্রকাশ্যে শ্রমিকদের হাতে হাতে বেতন ভাতার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। নয়তো বেসুমার লুটপাট হবে, অনেকেই অনেক কিছু ইসারা করবে। সরকার তখন দায় এড়াতে পারবে না।

এক্ষেত্রে আরো অর্থের প্রয়োজন হলে গার্মেন্টস মালিকদের ওপর লেবি আরোপ করুণ। সরকার জানে, কাদের কাছে টাকা আছে। ইতিমধ্যেই কারা ব্যাংকের ঋৃণ রিসিডিউলকরাসহ ঋৃণের সুদ মওকুফ করার জন্য দৌড়ঝাপ শুরু করেছে। কারা অর্থনীতির আপৎকালের আগাম অজুহাতে রাষ্ট্রের ব্যাংক লুটের পাঁয়তারা শুরু করেছে।

টানা কয়েক মাস লকডাউন হলেও বাংলাদেশে কেউ না খেয়ে মরবে না যদি সরকার লুটেরা শ্রেণীকে রূখতে পারে। ইউরোপীয়দের হাতে ডলার থাকে তারা ঘরে খাদ্য মজুদ করেনা। কিন্তু আমাদের দেশে ঐতিহ্যগতভাবেই বেশীরভাগ পরিবার সারা বছরের খাবার ঘরে রাখে। তবে অসুবিধায় পড়বে গরীব মানুষ। তাদের জন্যও সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এদেশের মানুষ পাড়ায় মহল্লায় গ্রামে গঞ্জে হাটে ঘাটে প্রত্যেকে প্রত্যেককে চিনে। দলগতভাবে আওয়ামিলীগের লোকদের বলুন, প্রতিটি এলাকায় ১/২শ জনের তালিকা করে ছোট ছোট গ্রুপ করে নিজের পাড়ার গরীব মানুষদের খাবার দিতে।

হাটে বাজারে কাজ করে চলা লোকদের খাবার দিতে সমাজের সবচেয়ে ধান্ধাবাজ ব্যবসায়ী নামের বজার লুটেরা দোকানদারদের বলুন ওদের খাবার দিতে। এমনিভাবে সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর সুবিধা ভোগীদের বাধ্য করুন মহামারির এই দূঃসময়ে তার চার পাশের লোকদের জন্য কিছু করতে। আর এই সব কাজের দায়িত্ব দিতে হবে সেনাবাহিনীকে। অন্যথায় গরীব মানুষের জন্য দেওয়া সরকারি বরাদ্দ মহামারির চেয়েও ভয়াবহরূপে লুটপাট শুরু করে দিবে সুবিধা ভোগীরা।

গণমাধ্যম মালিকদের দরদ উপচে পড়ছে

করোনা ভাইরাস সংক্রমনের পর থেকে কিছু গণমাধ্যম মালিকদের দরদ ও দায়িত্ববোধ যেন উপচে পড়তে শুরু করেছে। বুঝা মুশকিল এর কতটা আন্তরিকতা আর কতটা ধান্ধাবাজি। প্রতিদিন কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জাতিকে খবরের কাগজ পড়ার পরামর্শ দিচ্ছে। অথচ কোন কাগজেই শুধু মাত্র কতিপয় ব্যক্তির সুরৎ দেখানো ছাড়া নতুন কোন খবর থাকে না।

অপরদিকে গণমাধ্যমগুলো আগেরমতই অরক্ষিত। সংবাদ কর্মীদের কারো সুরক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। যে পরিমান ঝুঁকি নিয়ে মাঠে ময়দানে স্বাস্থ্য কর্মী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দৌড়াচ্ছেন ঠিক ততটা ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ কর্মীরাও কাজ করছেন। কিন্তু তাদের সুরক্ষার কোন প্যাকেজ নাই। সংবাদ কর্মীরাওতো মানুষ। তাদেরও জীবন আছে, আছে স্ত্রী পুত্র কন্যা পরিবার পরিজন। তারাওতো বাঁচার অধিকার রাখে। না, সংবাদ কর্মীরা করোনা ভাইরাসের আত্মীয়। যদি তা না হয় তবে সংবাদ কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট প্যাকেজ ঘোষণা করেনা কেন নওয়াবরা। করোনার এই ভয়াবহ দূঃসময়ে এসএটিভি থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই হলো। ইউনিয়ন প্রতিবাদ করলো, প্রতিকার চাইলো অথচ যাদের দেখার দায়িত্ব তারা শুধু বললো ” অনভিপ্রেত”।

সাংবাদিক বন্ধুরা,
দূঃসময়েই স্বজন চেনা যায়। তাই চিনে রাখুন, সময়ে কাজে লাগবে। এই দূঃসময় কেটে গেলে বুঝাপড়া একটা হবেই হবে। মালিকদের বানিজ্যিক তদবিরবাজ সাংবাদিক বন্ধুদের বলি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নয়, নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করে জাতীয় স্বার্থে কাজ করুণ। প্রয়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহারে নিরাপদ থেকে দায়িত্ব পালন করুন। সরকারও অনলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় তথ্য ও করণীয় বিষয়ে ব্রিফিং করছে। তাহলে সংবাদ কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন মাঠে ময়দানে দৌড়াতে হবে। মালিকদের ধান্ধাবাজি আর লুটপাট তদবিরের সব নথিপত্র সংরক্ষণ করুন। নিজেকে সুস্থ্য রেখে বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করুন। করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতায় বিশ্বব্যাপী অনেক কিছুই পাল্টে যাবে। সুতরাং ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এখন বেঁচে থাকাই জরুরি।

লেখক : ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ