নিঃশব্দ-নীরব জীবনের ভাবনা ও অনুভূতির উপাখ্যান ‘ত্রিকোণমিতা’

প্রকাশিতঃ ৬:৪১ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০

লেখকঃ জয়নাল আবেদীন
প্রকাশনীঃ ভূমিপ্রকাশ
মূল্যঃ
স্টল নংঃ

ডা. জয়নাল আবেদীন :

“ত্রিকোণমিতা” সাইজে ছোটো বই। ২০৮ পৃষ্ঠার এই বই আকারে বিগত বছরের “বিভ্রম” এর অর্ধেকের চেয়েও কম। প্রথম বই শিকল ছিল এর চেয়ে সোয়াশ পৃষ্ঠা বেশি।

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এই বইটা লিখতে গিয়ে আমাকে ভুগতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

আমি কী পরিমাণ ভুগেছি তার দুইটা উদাহরণ দেই।

খেয়াল করেছেন কিনা জানি না, বইয়ের প্রচ্ছদ দশ দিন আগে হয়ে গেলেও কাভার ফাইনাল হয়েছে গতকাল। কারণ কাহিনী সংক্ষেপ। ভূমিপ্রকাশের ঐতিহ্যমতে বইয়ের ব্যাক কাভারে কাহিনী সংক্ষেপ লিখে দিতে হয়। আমি গত দশ দিন ধরে চেষ্টা করছি একটা কাহিনী সংক্ষেপ দাঁড় করানোর, কিন্তু লিখতে পারিনি। একদিন একদিন করে দেরি হয়, পিছিয়ে যায় কাভার চূড়ান্তের দিন। শেষ পর্যন্ত গত পরশু এসে মনে হলো, ত্রিকোণমিতার কাহিনী সংক্ষেপ লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। (লেখা সম্ভব, কিন্তু স্পয়ালার এড়িয়ে লেখা আমার দ্বারা সম্ভব হয়নি।

আমি মাত্র দুই লাইন দিয়ে দিলাম ব্যাক কাভারের জন্য, “ত্রিকোণমিতা নিঃশব্দ-নীরব জীবনের ভাবনা ও অনুভূতির উপাখ্যান।”

কাহিনী সংক্ষেপ লেখা যে এতটা কঠিন সেটা এবারই প্রথম বুঝলাম এবং আমার ধারণা ভবিষ্যতেও কোনো গল্পের কাহিনী সংক্ষেপ লিখতে গিয়ে আমাকে এতটা ভুগতে হবে না।

ত্রিকোণমিতা’র ভোগান্তির আরেকটা উদাহরণ দিই।

গল্পের মাঝামাঝিতে ছিলাম তখন, বিশেষ একটা জায়গায় নায়িকার অনুভূতির বর্ণনা দিতে হবে। গল্পের মোড় এবং ঘটনার রেশ এমনটাই ছিল যে, নায়িকার অনুভূতি লিখতে গিয়ে আমি আটকে গেলাম। একটা পুরো রাত কী বোর্ডের সামনে বসে থাকলাম, লিখতে পারলাম না কিছুই। পরের রাতে লিখতে গিয়েও দেখি একই অবস্থা। ঐ বিশেষ অবস্থায় একটা মানুষের অনুভূতি কেমন হবে সেটা কোনোভাবেই ঠিক করতে পারছি না দেখে ফোন করলাম প্রকাশক Zakir ভাইকে। প্রকাশক পরিচয়ের বাইরেও জাকির ভাই একজন ভালো লেখক এবং সাহিত্য বিষয়ে বোদ্ধা শ্রেণীর মানুষ। জাকির ভাইকে বললাম, ভাই! আমারে উদ্ধার করেন। ‘এমন’ ঘটনায় নায়িকার অনুভূতি কেমন হওয়া উচিত বলেন।

জাকির ভাই বললেন, “ভাই কী বলব বুঝতে পারছি না। একটু বেশিই জটিল হয়ে গেল কিনা!”

Rudra Kaiser আমার বন্ধু শ্রেণীর মানুষ এবং সাহিত্য ব্যাপারে অগাধ জ্ঞান থাকার জন্য তাকে আমি মনে মনে রেস্পেক্ট করি। পরের দিন তাকে ডেকে নিয়ে আসলাম হাসপাতালে। তিন ঘন্টা আটকিয়ে রেখে নায়িকার অনুভূতি কী হওয়া উচিত, পরামর্শ চাইলাম। বেচারা দাঁত ক্যালাইয়া কয়, “এত জটিল জিনিসের সমাধান আমার কাছে নাই। ঘটনা এমন প্যাঁচাইলেন ক্যান?”

যে ঘটনার প্রেক্ষিতে নায়িকার মনোজগতে এতটা জটিলতা সেটা গুরুজনদেরকে শেয়ার করা কিছুটা বিব্রতকত। লেখার চাপে আমি লজ্জা-শরম ভুলে গিয়ে শ্রদ্ধেয় Shahidul Islam স্যারের চেম্বারে গেলাম এই ব্যাপারে ডিসকাস করতে। স্যার বাংলা সাহিত্যের সব মাস্টারপিস পড়া মানুষ, ভাবলাম কোনো না কোনো ভাবে উদ্ধার পাব। শেষ পর্যন্ত স্যারও আমাকে নিরাশ করলেন, বললেন এমন জটিল মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ফুটিয়ে তোলা আসলেই কঠিন হবে।

যারা নিয়মিত কাছাকাছি তাদেরকে বিরক্ত তো করেছিই, তবুও আমার এই অচলাবস্থা থেকে উদ্ধার হতে সময় লেগেছে পাক্কা চারদিন। চারদিন পর মনে হয়েছে, এট লাস্ট আমি অনুভূতি প্রকাশের সঠিক ভাষাটা খুঁজে পেয়েছি। ততদিনে জানুয়ারির ২০ তারিখ পার করে হয়ে গেছে, নিশ্চিত করে ফেলেছি আমার বই মেলার শুরুতে আসছে না।

আমি জানি না শেষ পর্যন্ত এই বইটা কার কাছে কেমন লাগবে। হয়তো কারো কারো কাছে ততটা ভালো নাও লাগতে পারে, কেউ যদি জঘন্য বলেন, সেটাও মেনে নিতে প্রস্তুত আছি।

তবে যারা শিকল ও বিভ্রমকে নিজেদের পছন্দের তালিকায় জায়গা দিয়েছেন, আপনাদেরকে এতটুকুই বলে রাখি…এই বইটা লিখতে গিয়ে আমি আগের চেয়ে দ্বিগুণ পরিশ্রম করেছি, যত্ন নিয়েছি। আমার ডেডিকেশন এই বইটায় সর্বোচ্চ ছিল।

শিকলের মতো আবেগ এখানে পাবেন না, বিভ্রমের মতো কুটিল রাজনীতি বা অনেকগুলো চরিত্রের অনেক রকম গল্প নেই। এই উপন্যাসে আছে অনুভূতি, বিষণ্ণতা এবং মানব মনের চিরন্তন টানাপোড়েনের গল্প।

আপনি বইটা পড়তে অবশ্যই বাধ্য নন, আপনাকে ফোর্সও করব না। তবে প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমী হলে ত্রিকোণমিতা বইটা আপনার পড়া উচিত। আশা করা যায় “কী পড়লাম” “টাইম নষ্ট” “টাকা ফেরত চাই” ধরণের রিএকশন আপনার হবে না।

আমি লেখক হবার বহু আগেই একজন পাঠক, তারও আগে একজন বোধসম্পন্ন মানুষ।

আমার কথায় ভরসা রাখতে পারেন।

ভালোবাসা রইল। 

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ