পরকীয়া (পর্ব–৫)

প্রকাশিতঃ ৩:৫২ অপরাহ্ণ, মঙ্গল, ১০ ডিসেম্বর ১৯

ডা. আফতাব হোসেন :

রাত্রির শেষ প্রহর বোধহয়। এতক্ষণে ঢাকা শহরের এ দিকটাও ঢেকে গিয়েছে নীরবতার চাদরে। এ বিশাল ছাদে, আলো আঁধারের মাঝে আমি এখনও একা দাঁড়িয়ে আছি। আকাশের দিক তাকাই। কত তারা জ্বলছে সেখানে মিটিমিটি। দূর থেকে তাদের কত কাছাকাছি মনে হয়। অথচ একে অন্যের থেকে কত শত আলোক বর্ষ দূরে। মানুষগুলোও বোধহয় অমনি। দূর থেকে তাদের খুব কাছাকাছি মনে হলেও মনের দিক থেকে হয়ত যোজন যোজন দূরে। আকাশের ঐ তারাদের মতো, একটু আগে চলে যাওয়া অমাবস্যা রাতের রহস্যময়ী নারীর মতো, দূরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্প পোস্টের মতো, একান্তই একা।

ভদ্রমহিলার কথা মনে হতেই বুকের ভেতর অনেকগুলি প্রশ্ন বিলের জলে পা ডুবিয়ে থাকা নিঃসঙ্গ বকের মতো গলা বাড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারে। আচ্ছা, উনি বেছে বেছে অমাবস্যার রাতেই ছাদে আসেন কেন? এই বাড়িতেই তো থাকেন। যে কোনো রাতেই তো আসতে পারেন। নাকি অন্য রাতে তাঁর আসার অনুমতি নেই? নাকি এই একটি রাতেই তিনি আসার সুযোগ পান? কেন বললেন আমাকে, “তোমাকে তো আর সারাক্ষণ ভালোবাসার, ভালো থাকার অভিনয় করতে হয় না?” তাহলে কি ওনাকে ভালোবাসার, ভালো থাকার অভিনয় করতে হয়? এ সব কৌতূহল মেটাতে হলে হয়ত আমাকে আর একটা অমাবস্যা কিংবা আরও অনেকগুলি অমাবস্যার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। হঠাৎ এক দমকা বাতাস বয়। বেশ হিম হিম ঠাণ্ডা হাওয়া। আমার শীত করে ওঠে। মানুষের মনটা বুঝি পাখির মতো, যতই আকাশে উড়ুক, যতই এ গাছের ডালে, ও গাছের ডালে যেয়ে বসুক, এক সময় ঠিক আপন নীড়ে ফিরে আসতে হয়। আমিও আমার উড়ুউড়ু মনটা নিয়ে আমার ছোট্ট নীড়ে ফিরে আসি।

বাপ বেটা আলুথালু হয়ে ঘুমায় অঘোরে। বাবুটা তার একটা পা তুলে দিয়েছে বাবার গায়ে। খুব বাবার নেওটা। শুধু সকাল বেলা ছাড়া বাবার মুখ দেখে না। তাই বুঝি ঘুমের মাঝেও বাবাকে ছুঁয়ে থাকে। সব সন্তানই বুঝি অজান্তেই বাবার ভেতর খুঁজে ফেরে আশ্রয়। অবাক হয়ে দেখি, বাবাও তাঁর একটি হাত আলগোছে রেখে দিয়েছে সন্তানের গায়ের উপর। ঘুমের ভেতরেও যেন দিচ্ছে ছেলেকে আশ্বাস, দিচ্ছে ভরসা। যেন বলতে চাইছে, ভয় পেও না, আমি আছি, আমি থাকব। আমি দু’চোখ ভরে পিতা পুত্রেই এই পারস্পরিক নির্ভরতাকে দেখি। আর তখনই মনে হয়, আমি শুধু সুমনের স্ত্রী নই, আমি এই ফুলের মতো সুন্দর শিশুটির মা। আর তখনই আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। আমার সব একাকীত্ব মুছে যায়। আমার মনে হয়, এই শিশুটির আমি সব কিছু করতে পারি। এই শিশুটি আমাকে নারী জনমের সার্থকতা এনে দিয়েছে।

তবু কেন আমার এত একা একা লাগে? কেন আমার রাতগুলো নির্ঘুম কাটে? এ কি সুমন এখন আমাকে আর সময় দিতে পারে না বলে? নাকি সুমন এখন আর আগের মতো আদর করে না বলে? আসলেই কি ভালোবাসা আমাকে স্বার্থপর করে দিয়েছে? নইলে কী পাইনি ভেবে মনটা কেন সারাক্ষণ হাহাকার করে? আমি ভালো করে সুমনকে দেখি। ঘুমন্ত সুমনের মুখটা শিশুর মতো সরল দেখায়। প্রত্যেক পুরুষের ভেতরেই বুঝি একটি শিশু বাস করে। বাইরের পৃথিবীর সাথে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করলেও ঘরে ফিরে সে কোনো এক নারীর বুকে আশ্রয় পেতে চায়। আমরা মেয়েরা বোধহয় সব সময় তা বুঝতে পারি না। আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। আমি পায়ে পায়ে সুমনের দিকে এগিয়ে যাই। জীবনে এই প্রথম আমি নিজে থেকে সুমনকে জাগিয়ে তুলি। বহুদিন পর যেন সুমনও নিজেকে ফিরে পায়। তারপর, ধানমণ্ডির লেকের পাশে, পাঁচতলা বাড়ির বিশাল ছাদে, ছোট্ট চিলেকোঠায় এক ছোটখাটো প্রলয় বয়ে যায়।

তৃপ্ত, ক্লান্ত সুমন অস্ফুটে জানতে চায়, এ তুমি কোন তুমি? এমন রূপ আগে তো কখনও দেখিনি!
মনে মনে বলি, নারীর যে কত রূপ, কী করে জানবে তুমি? মুখে কিছু বলি না। একটি শিশু ছেড়ে আমি অন্য শিশুটির কাছে ফিরে আসি।

আমি বুঝে যাই, একটুখানি কাছে এগিয়ে আসা, একটুখানি বেশি ভালোবাসা, একটু কম্প্রোমাইজ, একটু স্যাক্রিফাইস, জীবনকে অন্য মাত্রা এনে দিতে পারে। আর ভালোবাসার মানুষটির জন্য এতটুকু তো আমি করতেই পারি। সেই থেকে আমাদের জীবন তার পুরনো ছন্দ ফিরে পায়। সুমন ফিরে পায় তার আত্মবিশ্বাস। দিনগুলি কেটে যায় আমার মহা ব্যস্ততায়। দুটি শিশু আমার নারী জীবন পরিপূর্ণ করে দেয়। আমার রাতের ঘুম ফিরে আসে। এরই মাঝে মাস ঘুরে কখন আর এক অমাবস্যা এসে ফিরে চলে যায়, আমি জানতেও পারি না। জানতে পারি না, আমার আঁধার রাতের সহচরী, এসেছিল কিনা সে অমাবস্যা রাতে। রহস্য ছড়াতে। বড় স্বার্থপর মানুষের মন। দুর্দিনে যাকে খুব করে মনে পড়ে, সুদিনে তাঁকে অবলীলায় ভুলে যায়।

বহুদিন পর এক রাতে, আবার আমার ঘুম আসে না। না, কোনো কারণে নয়। এমনিতেই। মাঝে মাঝে সুখেরও বুঝি অসুখ হয়। বহুদিন পর আমার ছাদ সহচরীর কথা মনে পড়ে। চন্দ্র মাসের কত তারিখ আজ? শীত পড়ে গেছে। বাবুটার ঠাণ্ডা লাগতে পারে, তাই সন্ধ্যা হলেই বন্ধ করে দেই ঘরের দরজা জানালা। বহুদিন আমার রাতের আকাশ দেখা হয় না। রাতের আঁধারে দুটি সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের মনের কথা বলা হয় না। নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হয়। আমি একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। অবাক হয়ে দেখি, ছাদে, আমার সান বাঁধানো এই বিশাল উঠোনে, এখানে সেখানে, থোক থোক কুয়াশা। তারই ফাঁকে ফাঁকে ধবল জোছনা খেলা করে। মাথার উপরে পূর্ণ চাঁদ। একটু ঘোলাটে দেখায়। বেশ কুয়াশা পড়েছে আজ। কুয়াশার ভেতর চাঁদের আলো, কেমন এক ঘোর লাগা, পাগল করা পরিবেশ। এই চাঁদনি পসর রাতে নিশ্চয়ই আসবেন না তিনি। আমার খুব ইচ্ছে করে, সুমনকে ডেকে নিয়ে আসি। এই জোছনার মতো কুয়াশার সাথে খেলি লুকোচুরি।

– এতদিন পর এলে?

চমকে তাকিয়ে দেখি, আমারই মতো চাদর গায়ে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে নিশীথিনী। থতমত খেয়ে বলি

– কেমন আছেন ভাবি?

এই প্রথম আমি তাঁকে ভাবি বলে ডাকলাম। এই মহলের নারীরা একে অন্যকে ভাবি বলেই ডাকে।

– ভাল আছি সানিয়া। আমাদের ভালো থাকতে হয়। তোমার কথা বলো। নিশ্চয়ই রাতের ঘুম ফিরে এসেছে তোমার?

ম্লান হেসে বলেন তিনি। কথার ভেতরে সেই রহস্যের মায়াজাল। সেই চাঁপা কষ্টের নীরব কান্না। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করে, আপনিই তো আমার রাতের ঘুম ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনার কথা শুনেই তো আমি ফিরে পেয়েছি আমার হারিয়ে যাওয়া সুমনকে। বলতে পারি না। একজন দুঃখে কাতর মানুষের কাছে সুখের কথা বলা যায় না। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আপনি তো শুধু অমাবস্যার রাতে আসতেন, আজ এই পূর্ণিমায় কেন? জিজ্ঞেস করতে পারি না। অশোভন দেখায়। তবে কেন জানি আমার মনে হয়, গত দেড় মাসে, শুধু অমাবস্যা রাতে নয়, অনেক রাতেই তিনি খুঁজেছেন আমায়। হয়ত রহস্যময়ী এই নারী তাঁর জীবনের কথা বলতে চান আমাকে। বলি,

– এমন জোছনা ভেজা রাতে কেমন পাগল পাগল লাগে আমার। ঘুম আসে না। আজ আপনাকে ছাড়ছি না। সারা রাত আপনার গান শুনব। আপনার জীবনের গল্প শুনব।

– জীবনের গল্প ! আমাদের জীবনে, প্রতিদিন প্রতিক্ষণে, ঘটে চলে কত ঘটনা ! তাঁকে তো গল্পই বলা যায়। কেউ তা শুনতে চায় না। কারও শোনার সময় হয় না। তবে আজ তোমাকে বলব। অন্তত একজন কেউ সাক্ষী হয়ে থাক। আমার না বলা কষ্ট কথার। চলো, ও দিকটায় শেডের নীচে বসি।

এই ছাদে আয়োজনের কমতি রাখেনি বাড়ির মালিক। ছাদের এক পাশে, কাঁচের ছাউনি দিয়ে তৈরি করেছেন বসার জায়গা। যাতে বৃষ্টিতে না ভিজেও বৃষ্টির নীচে বসতে পারা যায়। কুয়াশা গায়ে না মেখেও কুয়াশার মাঝে থাকতে পারা যায়। আমরা দুজন সে শেডের নীচে গিয়ে বসি। ভালো করে জড়িয়ে নিই গায়ের চাদর।

– আচ্ছা, তুমি তো প্রেম করেছ। বলতে পারো, মানুষ প্রেমে কেন পড়ে ?

আচমকা তাঁর এই প্রশ্নে আমি থতমত খেয়ে যাই। কী জবাব দেব এর ? একটু ভেবে নিয়ে বলি,

– মানুষ কেন প্রেমে পড়ে আমি জানি না। তবে আমার মনে হয়, প্রত্যেক মানুষই প্রেমে পড়ে। কারোটা প্রকাশিত হয়। কারোটা অপ্রকাশিতই রয়ে যায়।

– ঠিক বলেছ। এই পৃথিবী শুধু প্রকাশিত প্রেমকেই প্রেম বলে মানে। প্রকাশিত প্রেম কাহিনী নিয়েই রচিত হয় কবিতা, গান, উপন্যাস। অথচ অপ্রকাশিত প্রেমও যে প্রকাশিত প্রেমের চেয়ে গভীর হতে পারে, জানে না কেউ। মানতে চায় না কেউ।

– মানে এক তরফা প্রেম ?

– বোকা মেয়ে। প্রেম তো প্রেমই। তা কি এক তরফা দুই তরফা হয় ? মানুষ যখন এক তরফা ভাবেও কারও প্রেমে পড়ে, তখনও সে ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে যায়। একটা মায়াবী ঘোরের মধ্যে চলে যায়।

– কিন্তু এই ভালো লাগার কথা, এই ঘোরের কথা যদি অন্যজন নাই জানল, তাহলে প্রেম হবে কেমন করে?

– মুশকিলটা তো সেখানেই। সবাই কি সংকোচ কাটিয়ে, সাহস করে, নিজের ভালো লাগার কথা, ভালোবাসার কথা বলতে পারে? বিশেষ করে মেয়েরা ? তাই বলে কি তার অনুভূতি, তার ভালোবাসা কম হয়ে যায়? এসো, আমার জীবনের গল্প বলি। তাহলে বুঝতে পারবে।

এই ঢাকা শহরেই এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। বেশ রক্ষণশীল পরিবার। ছোটবেলা থেকেই আমাকে শেখানো হল, আমি মেয়ে। নিজেকে রেখে ঢেকে রাখতে হবে। আস্তে কথা বলতে হবে। রাস্তায় মাথা নিচু করে চলতে হবে। বাইরে আড্ডা দেয়া যাবে না। মাঠে খেলাধুলা করা যাবে না। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করলাম, কই, ভাইয়াকে তো এ সব বলো না? মা বলল, কারণ ভাইয়া ছেলে। ও যা পারে, তুমি তা পারো না। আমি বুঝে গেলাম, ভাইয়া ও আমি দুজন একই মায়ের গর্ভে জন্মানো স্বত্বেও শারীরিক ভাবে দুজন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। ও হল ছেলে মানুষ আর আমি হলাম মেয়ে মানুষ। ও যা পারে, আমি তা পারি না। এই না পারার বোধকে মনে ধারণ করে একজন মেয়ে মানুষ হিসেবেই ধীরে ধীরে আমি বড় হতে থাকলাম।

বড় হতে হতে আমি লক্ষ্য করলাম, ভাইয়ার চাইতে আমি লেখা পড়ায় অনেক ভালো। শুধু ভাইয়া নয়, ক্লাসে সব ছেলে মেয়েদের চাইতে ভালো। প্রতি পরীক্ষায় সব ছেলে মেয়েদের টপকে আমি ফার্স্ট হতে থাকলাম। আমি অবাক হয়ে আরও লক্ষ্য করলাম, শুধু পড়াশুনা নয়, আমার গান ভালো লাগে, আমার কবিতা ভালো লাগে। যে কোনো গান শুনে আমি গলায় সুর তুলে নিতে পারি। কবিতা পড়লে আমার মন কেমন করে ওঠে। স্কুলে থাকতেই আমি চুপি চুপি ডায়রির পাতায় কবিতা লিখতাম, গান লিখতাম, গল্প লিখতাম। অথচ ভাইয়া এ সব কিছুই পারত না। পারবে কী ? ভাইয়া তো কবিতা ভালো করা বুঝতই না। এক সময় আমার মনে হল, ভাইয়া কিংবা অন্য ছেলেদের চাইতে শারীরিক গঠনের দিক থেকে ভিন্ন হলেও, তাদের চাইতে শারীরিক শক্তির দিক থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল হলেও, প্রতিভার দিক দিয়ে, মন ও মননশীলতার দিক দিয়ে আমি অনেকের চাইতে অনেক ভালো।

মেট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে খুব ভালো রেজাল্ট করে সেটা প্রমাণও করে ফেললাম। তবে আর পাঁচটি ভালো রেজাল্ট করা মেয়ের মতো মেডিকেলে ভর্তি না হয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশ অনার্সে ভর্তি হলাম। কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে আমার তথাকথিত রক্ষণশীল পরিবার বাঁধা দিল না। তখন কী করে বুঝব, আসলে আমার পরিবার তখন আমার নারী জনম সার্থক করার জন্য বিয়ে দেয়ার চিন্তা করছেন? যদিও ঢাকা ভার্সিটির মুক্ত পরিবেশ আমার সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হবার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, কিন্তু ছোটবেলা থেকে তৈরি হওয়া আমার রক্ষণশীল মানসিকতা সে পথে অন্তরায় হয়ে রইল। চাইলেই আমি ভার্সিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতে পারতাম, কবিতা আবৃত্তি করতে পারতাম, কিন্তু সংকোচে আমি নিজের ভেতরেই গুটিয়ে রইলাম। আমাদের সাথেই পড়ত কায়সার মাহমুদ। সেও কবিতা লেখে, কবিতা আবৃত্তি করে, গান গায়। তার কবিতা পড়লে আমার বুকের ভেতর তোলপাড় করে, তার ভরাট কণ্ঠের আবৃত্তি শুনলে আমার গায়ে কাঁটা দেয়, তার গানের সুরে আমার মনটা দুলে ওঠে। তার হাসি, তার কথা, তার সব কিছুই আমার ভালো লাগে। বুঝলাম, ছেলেটির প্রতি আমার এক ধরণের মোহের ভাব তৈরি হয়েছে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে যে সংযমের শিক্ষা আমি পেয়েছি, সংযত থাকার যে অভ্যাস আমার গড়ে উঠেছে, তা আমার মনোভাব প্রকাশে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া আমরা মেয়েরা বড় আত্মাভিমানী। লজ্জা, সংকোচ আমাদের ভূষণ। সে ভূষণ সরিয়ে, আমার ভালো লাগার কথা নিজ থেকে প্রকাশ করতে পারলাম না। ভেবেছিলাম, একই সাথে একই ক্লাসে পড়ি, মাত্র সেকেন্ড ইয়ার, এখনও কত সময় সামনে পড়ে আছে। তোমার মতো সেদিন আমিও ভেবেছিলাম, প্রেম তো আর এক তরফা হতে পারে না। তারও যদি আমার মতো মনের অবস্থা হয়, একদিন প্রেম এমনিতেই হয়ে যাবে, নইলে নয়। তখন কে জানত, সে দিন আমার জীবনে আর কখনই আসবে না !

দিন, সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে যায়। অধির প্রতীক্ষায় কাটে আমার অস্থির সময়। কায়সার শুধু প্রেমের কবিতা লেখে, প্রেমের গান গায়। আর এক বুক প্রেম নিয়ে আমি বসে থাকি অপেক্ষায়। সে প্রেমের কবিতা বোঝে, প্রেমের গান বোঝে, অথচ প্রেম বোঝে না। তার এ উদাসীনতা আমি সইতে পারি না। আমারও জেদ চেপে যায়। সিদ্ধান্ত নিই, আমার বুক ফেটে গেলেও মুখ ফুটে কোনো দিন তার কাছে প্রেম ভিক্ষা চাইব না।

এ ভাবেই আশা নিরাশার দোলাচলে দুলতে দুলতে আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেল। একদিন মা এসে জানাল, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। সরকারী চাকরি করে। সরকারি খরচে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড যাচ্ছে। যাবার আগে বিয়ে করে বউ ইয়ে যেতে চায়। বলতে যেয়ে মা খুশিতে টগবগ করছেন। এমন ছেলে নাকি লাখে একটা মেলে না। বাবা নাকি পাকা কথা দিয়েও ফেলেছেন। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম,

– আমার বিয়ে, অথচ পাকা কথা দিয়েছেন বাবা ?

– বাহ, তো কে দেবে? বাবাই তো মেয়ের বিয়ে দেয়।

মা আরও অবাক কণ্ঠে বলেন। আমি নিজেকে সংযত করি। আমাদের সমাজে মা বাবাই তো মেয়ের বিয়ে দেয়। আমি তো এমনও শুনেছি, সাবালিকা মেয়ের বিয়ে না দিয়ে বাবারা নাকি হজেও যান না। আমি নরম গলায় বলি,

– না মা, আমি বলতে চাইছি, আমার বিয়ে অথচ আমিই জানি না !

– তোর পরীক্ষা, পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটবে, তাই বিরক্ত করিনি।

বাহ, কী অদ্ভুত যুক্তি! পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটবে বলে আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমাকে না জানিয়েই নেয়া হল, যা কিনা আমার পুরা জীবনটায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কিন্তু এই হয়ে আসছে। এই হয়। পুরুষ শাসিত এই সমাজে মেয়েদের জীবনের ফয়সালা পুরুষরাই নেয়। পুরুষরাই মেয়েদের পছন্দ কিংবা অপছন্দ করে। এখানে মেয়েদের পছন্দ অপছন্দের তেমন কোনো মূল্য নেই। আমার একার প্রতিবাদে এই প্রথা বদলাবে বলে মনে হয় না। ম্লান হেসে বলি,

– তা, আমাকে না দেখেই ছেলে পছন্দ করে ফেলল?

– না দেখে কেন? তোকে তো তারা দেখেছে, ভার্সিটিতে।

এতক্ষণে বুঝতে পারি। তবে এই কাজটা ভালো করেছেন বাবা। রক্ষণশীল বাবাকে কিছু কিছু ব্যাপারে আমার বেশ উদার মনে হয়। যেমন পড়াশুনার বিষয়ে আমার মতামতের মূল্য দিয়েছেন। নিজের মেয়েকে পুতুল সাজিয়ে, পাত্রপক্ষ নামক ইন্টার্ভিউ বোর্ডের সামনে, “বউ” নামক পদে চাকরির ইন্টার্ভিউ দেয়ার বিড়ম্বনার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। তবু আমতা আমতা করে বলি,

– আর আমার দেখার দরকার নেই?

– তা থাকবে না কেন? কাল তোর বাবা ওদের আসতে বলেছেন। তখন দেখিস। দেখতে খুব সুন্দর। আমার কাছে ছবি আছে। তুই দেখবি?

– না মা, থাক। কাগুজে বর দেখে আর কী হবে? কাল তো সশরীরেই আসছেন !

আমার কথা শুনে মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। বেশ কিছুক্ষণ চোখ কুচকে চেয়ে থাকল আমার দিকে। তারপর বলল,

– তোর মতলবটা কী বল তো? কোনো ছেলের সাথে সম্পর্কে টম্পর্কে জড়িয়েছিস?

মায়ের কথায় আমার উদাসী কবির চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কী বলব মাকে? যাকে পছন্দ করি, আমি তো জানিই না, সেও আমাকে পছন্দ করে কিনা। কথা ঘুরাতে বলি,

– না, মানে বলছিলাম কী, আমার পড়াশুনা তো এখনো শেষ হয়নি। মাস্টার্সটা শেষ করি।

– মাস্টার্স শেষ করে কী করবি ? তোর কি মাস্টারি করে খেতে হবে? ওরা ভীষণ বড় লোক। ছেলের নিজেরও প্রচুর

ইনকাম। তুই সারা জীবন রাজ রাণীর মতো পায়ের উপর পা তুলে খেতে পারবি।

– তাহলে এ পর্যন্তই বা পড়ালে কেন? তোমার মেয়ের যা চেহারা সুরত, আরও আগে বিয়ে দিতে চাইলেও মানুষ পছন্দ করে নিয়ে যেত।

– কী যে বলিস না তুই? আজ কালকার জমানায় মেয়ে ডিগ্রী পাশ না হলে ভালো বর পাওয়া যায়?

– তাঁর মানে তুমি বলতে চাইছ, মেয়েদের পড়াশুনা শুধু ভালো বর পাওয়ার জন্য? তাহলে তো এম এ পাশ পাত্রীর আরও ভালো বর পাওয়ার কথা।

আমার কথার মারপ্যাঁচে মা কুপোকাত হয়ে যায়। যুক্তিতে হেরে যেয়ে স্বল্প শিক্ষিত মাকে আমার খুব বিব্রত দেখায়। আমি জানি, মা যা বলছে, আমার ভালোর জন্যই বলছে। যা বোঝাতে চাইছে, তা আমাদের সমাজের জন্য বর্ণে বর্ণে সত্যি। নির্বিবাদী, আগাগোড়া ভালো মানুষ মায়ের জন্য আমার মায়া হয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মা বলে,

– মারে, কেন বুঝতে পারছিস না, মেয়েদের বয়স বেড়ে গেলে বিয়ে হতে চায় না। বিয়ের জন্য সবাই একটু অল্প বয়সী মেয়েই খোঁজে।

অমনি আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। আমি সাপের মতো হিসহিস করে উঠি,

– কেন? মেয়েরা কি কোরবানির গরু যে চার দাঁতের বেশি হলে কোরবানি জায়েজ হবে না? পুরুষরাই কেন শুধু কচি মেয়ে খুঁজবে? আর মেয়েদের কপালেই কেন জুটবে সব বুড়ো হাবড়ার দল?

– কী সব আজে বাজে বকছিস? তুই কি ইদানীং তসলিমা নাসরীন পড়ছিস?

– মাগো, তুমি কোন দুনিয়ায় থাকো? কেন নিজেদের এত ছোট ভাবো? একবার চোখ মেলে দেখো, যে দেশে তুমি বাস করো, সেই দেশটাও গত ত্রিশ বছর ধরে চালাচ্ছেন একজন নারী।

– হ্যাঁ। তাদের একজনের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আর একজনের স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আর তোর বাপ ব্যাংকের কেরানী হাবিবুর রহমান।

মাকে কেমন করে বোঝাই, এই দুই জন নারী তাদের স্বীয় যোগ্যতায় ঐ শিখরে পৌঁছেছেন। উত্তরাধিকার সূত্রে কিংবা কারও বদান্যতায় নয়। শুধু এই দুই জন কেন? পৃথিবীর অনেক দেশেই নারীরা রাষ্ট্র প্রধান হয়েছেন। হয়েছেন বৈজ্ঞানিক, পাইলট, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। করেছেন হিমালয় বিজয়। মাকে দোষ দিতে পারি না। শিশুকাল থেকেই তাঁর মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, সে একজন মেয়ে মানুষ। সে দুর্বল, সে অসহায়, সে অবলা। বেঁচে থাকার জন্য, নিরাপত্তার জন্য, তাঁর একজন পুরুষ মানুষের আশ্রয় বড় দরকার। সে কখনও বাবা, কখনও স্বামী, কখনও ছেলে আবার কখনো বা ভাই। যে দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাই নারী, সেই দেশেও নারীর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার নাই। আর শুধু মাকেই বা দোষ দেই কেমন করে? আমরা যারা নিজেদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বলে দাবী করি, পুরুষের কাছ থেকে সমান অধিকার আদায় করার জন্য শ্লোগান দেই, রাজপথে মানব বন্ধন করি, তারাই যখন বাসে উঠি, তখন প্রত্যাশা করি, একজন পুরুষ আমাকে সীট ছেড়ে দিক। অথচ আমি কখনও আর একজন পুরুষকে সীট ছেড়ে দেই না। হোক সে বয়স্ক কিংবা অসুস্থ। এখনও আমাদের সংসদে আসন সংরক্ষিত করে মহিলাদের সংসদে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়। এ দোষ কি শুধুই এই তথাকথিত পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থার নাকি কিছুটা হলেও আমাদের হীনমন্যতার? আমি জানি না।

চলবে…।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ