পরকীয়া (পর্ব-৬)

প্রকাশিতঃ ৬:২২ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ২ জানুয়ারি ২০

ডা. আফতাব হোসেন :

– মারে, জন্ম, মৃত্যু আর বিয়ে, এই তিনটি তো আল্লাহ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন। আমরা চাইলেই কি আর তা বদলাতে পারি?

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে মা এবার অন্য পথ ধরে। এই বুঝি এক শাশ্বত স্বভাব মানুষের। যখন যুক্তি হার মানে, তখন বিশ্বাস কিংবা আবেগকে টেনে আনে। বিধাতা আমার ভাগ্যে কোন বর ঠিক করে রেখেছেন আমি জানি না। তবে আমার জন্মদাতা পিতা যে বিধাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমার ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছেন, তা বুঝতে পারছি। আমি চাইলেই সে ভাগ্য অস্বীকার করতে পারি। আমি চাইলেই আমার পিতার চাপিয়ে দেয়া এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে পারি। কিন্তু কী লাভ? কার জন্য করব এই প্রতিবাদ? যার জন্য করব, তাকেই বা আমি কতটুকু চিনি? দূর থেকে একটা মানুষকে কতটুকুই বা চেনা যায়? কত প্রেমই তো বিয়ে অবধি পৌঁছায় না। আবার কত প্রেম বিয়ের পরেই শেষ হয়ে যায়। যে মা বাবার জন্য এই পৃথিবীতে আমার আলো বাতাস দেখা, যাদের কষ্টের বিনিময়ে আমার এই বেড়ে ওঠা, যাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় পূর্ণ এই জীবন, তাদের মনে কষ্ট দিয়ে, তাদের অসুখী করে, আমি যে সুখী হতে পারব, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? তাঁর চেয়ে এই ভালো, নিজেকে ভাগ্যের হাতেই সঁপে দেই ! ভাবতেই আমার ভেতর কী সব যেন ভাঙচুর হতে থাকে। এক অচেনা ব্যথায় টনটন করে ওঠে বুকের পাঁজর। কেন জানি আমার খুব কান্না পায়। কেন জানি আমার খুব গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। কোনমতে মাকে বলি,

– তোমাদের যা ভালো মনে হয়, কর। আমাকে আর বিরক্ত করো না।

কী বোঝে মা কে জানে। আর কিছু না বলে চলে যায়। যাবার সময় তাঁর দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দটা আমি ঠিক শুনতে পাই। মা কী আমার কষ্ট বুঝতে পারছে? একজন মা তাঁর মেয়ের কষ্ট যত সহজে বুঝতে পারে, অন্য কেউ তা পারে না। অথচ পারলেও অনেক সময় মায়েদের কিছুই করার থাকে না, কিংবা করতে পারে না। সমঝোতা করে চলার জন্যই বুঝি জন্ম মেয়েদের। আমি বালিশে মুখ গুঁজে শব্দ করে কেঁদে উঠি।

এই পর্যন্ত বলে থেমে যান ভাবি। থেকে থেকে কেঁপে ওঠে তাঁর শরীর। বুঝি উদ্গত কান্নাকে থামাবার চেষ্টা করছেন। চাঁদের আবছা আলোয় তাঁর ফর্সা মুখটা কেমন নীলচে দেখায়। দুচোখের দৃষ্টি দূরে দিগন্ত রেখায়। আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। যে বিধাতা এত যত্ন করে সৃষ্টি করেছেন মানুষ, সেই বিধাতাই কেন এত কষ্ট দেন মানুষের মনে? আমি ভাবিকে সময় দিই সামলে নেবার। এক সময় আমিই নীরবতা ভাঙ্গি,

– কায়সার ভাইয়ের সাথে একবারও যোগাযোগ করেননি?

– অভিমানী মেয়েরা যদি জেদি হয়, তাঁদের কষ্ট আর কে ঠেকায় ? শুনেছি, ভালোবাসা অনুভব করে নিতে হয়, বলে বোঝাতে হয় না। আমার ভালোবাসা যদি সে অনুভবই করতে না পারে, তবে বলে বুঝিয়ে কী লাভ ? তাই খুব অভিমান হয়েছিল। সব অভিমান ভুলে তাঁর কাছে যেয়ে দাঁড়ালে, সে হয়ত ফিরিয়ে দিত না। খুব অভিমান হয়েছিল বিধাতার উপরও। সব কিছু যদি আগে থেকেই ঠিক করে রেখে থাকো, তবে কেন খেলছ আমাকে নিয়ে এই পুতুল খেলা ? খুব জেদ চেপে যায় আমার। আমিও দেখতে চাই, ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে যায়। তাছাড়া, আমার মা বাবা আমারই বয়সী একটা বেকার ছেলের হাতে আমাকে কখনই তুলে দিত না। একমাত্র উপায় ছিল, তোমাদের মত পালিয়ে যাওয়া। তাতে সমাজের কাছে, স্বজনের কাছে, আমার মা বাবার মাথা হেঁট হয়ে যেত। সবাই ছিছি করত। আমাকে জন্ম দিয়ে, পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করে, কোনো অন্যায় তো তারা করেননি। তবে কোন অপরাধে অমানুষের মতো তাঁদের এত বড় শাস্তি আমি দিতাম? না, পারিনি, এত বড় স্বার্থপর আমি হতে পারিনি।

“তোমাদের মতো” কথাটা খুব কানে লাগে আমার। নিজেকে বড় স্বার্থপর আর অপরাধী মনে হয়। আমি মাথা নিচু করে বসে থাকি। তাই তো, যারা আমাকে জন্ম দিল, মানুষ করল, তাঁদের কোনো উপকারেই তো আসতে পারলাম না। শুধু নিজেকে নিয়েই আছি। ভাবী বুঝি আমার মন পড়তে পারে। বলে,

– মন খারাপ করো না। আমার ও ভাবে বলা উচিত হয়নি। আসলে বলা উচিৎ ছিল, তোমাদের মতো সাহস আমার ছিল না। তখন সাহসী হয়েছিলে বলে আজ সুখে আছ। আমার বাকি কাহিনী শুনলে তোমার আর মনঃকষ্ট থাকবে না।

ভাবী তাঁর কাহিনী বলতে শুরু করেন…

সে রাতে অনেক কাঁদলাম আমি। কেঁদে কেঁদে অনুভূতিগুলো যখন ভোঁতা হয়ে গেল, তখন কয়েকটা স্থির সিদ্ধান্ত নিলাম। আর কোনদিন ইউনিভার্সিটিতে যাব না। আর কোনদিন কায়সারের সামনে দাঁড়াব না। আর কোনদিন কবিতা লিখব না, গাইব না গান। কবিতার খাতাটা বের করে কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ফেললাম। যাকে ভেবে ভেবে লিখেছিলাম সব কবিতা, তাকেই যখন পেলাম না, কী লাভ তার জন্য লেখা কবিতাগুলো রেখে দিয়ে ? তখন বুঝতে পারিনি, খাতার পাতা কুটি কুটি করে ছেড়া গেলেও স্মৃতির পাতা যায় না।

পরদিন যথারীতি বর পক্ষ এলেন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, প্রথম দেখায় তাঁকে ভালো না লাগার কোনো কারণ ছিল না। লম্বা ছিপছিপে গড়ন, সুদর্শন, উচ্চ শিক্ষিত, সম্পদশালী। মির্জা বংশ। নাম মির্জা কৌশিক হায়দার। আর কী চাই? এ তো যে কোনো মেয়ের স্বপ্নের রাজ কুমার। কেমন স্বার্থপর মেয়েদের মন দেখো, আমি সেই বৈঠকে বসেই কায়সারের সাথে তাঁর তুলনা করতে শুরু করলাম। সব পরিমাপেই সে কায়সারের চেয়ে বহু বহু গুন ভালো। তাঁকে আমার ভালো লেগে গেল ! আমি কায়সারকে ভুলে তাঁকে নিয়েই স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করলাম।

যথা সময়ে ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। আমি বাসর রাতে বঁধু সেজে বসে আছি। একাকী। বসে বসে ভাবছি, কী ভাবে শুরু করব আমার নতুন জীবন ? কতটুকু জানে সে আমার সম্পর্কে ? সে কি জানে আমি কবিতা লিখতে পারি, গান গাইতে পারি ? যদি সে জানতে চায় ? যদি সে শুনতে চায় গান ? সিদ্ধান্ত নিই, তবে শোনাব তারে বাসর রাতেই আমার প্রিয় কোনো গান। কী অবাক কাণ্ড দেখো, মাত্র ক’দিন আগেই শপথ করেছিলাম, আর কোনদিন গান গাইব না, অথচ কেমন অবলীলায় সে শপথ ভুলে গেলাম !

আচ্ছা, এমন হ্যান্ডসাম দেখতে যে, তাঁর কোনো প্রেম ছিল না তো? মনে হতেই একটা কালো ভিমরুল বুকের ভেতর ঈর্ষার হুল ফুটিয়ে দেয়। এক চিনচিনে এক ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত শীরায় শীরায়। নিজেকে বোঝাই, থাকতেই পারে। আমারও তো ছিল। যদি জানতে চায় ? স্বীকার করব সব। সে কী করবে স্বীকার ? না করুক। আমি মেনে নেব। সে কি মেনে নেবে ? মনে মনে ভাবি, বোঝাব তারে। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অতীত তো থাকতেই পারে। সব অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাবার নামই তো জীবন। এইটুকু উদারতা একজন শিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে তো আশা করতেই পারি।

হঠাৎ খুট করে ঘরের একটা জানালা খুলে যায়। শীতের রাত। তাই বন্ধ ছিল। এক পশলা ঠাণ্ডা হাওয়া আমার শরীরে শীতল পরশ বুলিয়ে দেয়। কে খুলল জানালা ? যার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছি, তাঁর তো দরজা খুলে আসার কথা ! অবাক হয়ে জানালার দিকে তাকাতেই দেখি, জানালায় এক ছায়া মূর্তি। জানালা গলে টুপ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। চোর ডাকাত ভেবে আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠতে যাই। অমনি নিজ ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে বলে ওঠে ছায়া মূর্তি,

– চিৎকার করো না।

ভরাট গমগমে কণ্ঠ। খুব পরিচিত। কে? ততক্ষণে খাটের কাছে চলে এসেছে ছায়া মূর্তি। ঘরের হালকা আলোয় এবার তার মুখ আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। আমি যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারি না। সামনে দাঁড়িয়ে কায়সার মাহমুদ। আমি দুচোখ কচলে পরিষ্কার করে আবার দেখি। হ্যাঁ। কায়সার মাহমুদ। মাথাময় এলোমেলো চুল। মুখে বেশ কদিনের অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি। চোখের নীচে কালি। বিদ্ধস্থ চেহারা। যেন ঘুমায়নি কতকাল। শুধু চোখ দুটো আগের মতই উজ্জ্বল। তীক্ষ্ণ। সে চোখের দৃষ্টি আমি সইতে পারি না। কোনোমতে উচ্চারণ করি,

– তুমি ?

– কী করে পারলে অহনা ?

– কী ?

– বিয়ে করতে ?

– কেন পারব না ?

– আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি আমাকেই ভালোবাসো।

– ভেবেছিলে ? কই, কোনদিন তো জানতে চাওনি?

– জানতে চাইতে হবে কেন? আমি তো জানতাম। তুমি জানতে না, কাকে নিয়ে লেখা আমার সব কবিতা ? কার জন্য গাই আমি গান ?

শুনে আমি বোবা হয়ে যাই। এ কি শুনছি আমি ? ওর সব কবিতা, সব গান, শুধু আমারই জন্য ? স্পষ্ট টের পাই, বুকের ভেতর বইছে এক কালবৈশাখী ঝড়। সে ঝড়ে তছনছ হয়ে যাচ্ছে একটু আগে সাজানো আমার স্বপ্নের বাড়ি ঘর। অস্ফুটে জানতে চাই,

– কোনদিন তো বলনি ?

– বলতে হবে কেন ? তুমি বুঝতে পারনি ? তুমি না কবি ? একজনের মনের কথাই যদি বুঝতে না পার, তবে কেমন করে কবিতা লেখো তুমি?

কী জবাব দেব এর ? কেমন করে বলি তারে, এক অবোধ্য অভিমান বুকে নিয়ে বসে ছিলাম আমি, কখন আসবে তুমি ? সেই তুমি এলে। তবে বড় দেরি করে এলে। কেন এলে কায়সার? কী করব আমি ? আবার সেই অভিমানী ঢলে ভরে ওঠে বুক, প্লাবিত হতে চায় দুই চোখ। না, এখন আর কিছু করার নেই আমার। কোনমতেই দুই পরিবারের মান সম্মান ধুলায় মিটাতে পারব না আমি। কঠোর হতে হবে আমাকে। মনে মনে বলি, আমাকে ক্ষমা করো কবি। গলায় সাপের বিষ ঢেলে বলার চেষ্টা করি,

– তাই বুঝি রাতের অন্ধকারে চোরের মতো জানালা টপকে একটা মেয়ের বাসর ঘরে ঢুকে প্রেম নিবেদন করতে এসেছ ? কী করে ভাবলে, তোমার মতো চাল চুলাহীন একটা ছেলেকে ভালোবাসব আমি ?

– আমি জানি, এ তোমার মনের কথা নয়।

– মনের কথাই যদি বুঝতে, তাহলে অনেক আগেই আসতে তুমি। চলে যাও। তুমি এখুনি চলে যাও। যে কোনো সময় আমার বর চলে আসবে।

– তুমি তো কাউকে জানতে দাওনি, তোমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আমি জানব কেমন করে? যখন আমি জানলাম, তখন অনেক হয়ে গেছে। জানি, তোমার যোগ্য আমি নই। নিজের সাথে নিজে অনেক যুদ্ধ করেছি। শেষ পর্যন্ত আমার কাছেই আমি হেরে গেছি। তুমিই আমার কবিতা। তুমিই আমার গান। তোমাকে না পেলে আমার কবিতারা মরে যাবে। আমার গানের সুর চলে যাবে। তুমিহীন আমার জীবনটা অর্থহীন হয়ে যাবে। এখনও সময় আছে। আমার হাত ধরো। চলো, দূরে কোথাও চলে যাই।

বলে খাটে বসে হাত বাড়িয়ে দেয় কায়সার। যে হাত ধরব বলে কত রাত ভেবেছি, যে হাতের ছোঁয়া পাব বলে কতবার শিহরিত হয়েছি। যে কথাগুলো শুনব বলে কত রাত বিনিদ্র কাটিয়েছি। সে মানুষটা বসে আছে আমার সামনে দুহাত বাড়িয়ে। চাইলেই ও হাত আমি ছুঁয়ে দিতে পারি। চাইলেই ঐ হাত ধরে চলে যেতে পারি আমার স্বপ্নের দুনিয়ায়। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তব এক জিনিষ নয়। এক মিথ্যা অভিমানে, এক অযৌক্তিক জেদে, আমিই আমার স্বপ্নকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছি। সে স্বপ্ন আর জোড়া লাগার নয়। আর কিছুক্ষণ কায়সার সামনে থাকলে আমি আর আমাকে ধরে রাখতে পারব না। মিনতি ঝরে পড়ে আমার গলায়,

– আমি এখন অন্যের স্ত্রী। এ সব কথা শোনাও আমার পাপ। তুমি চলে যাও কবি। আমাকে আর কলঙ্কিত করো না। মনে করো, যে অহনাকে তুমি চিনতে, জানতে, ভালোবাসতে, সে অহনা মরে গেছে।

বলে ডুকরে কেঁদে উঠি আমি। কষ্টে আমার বুকটা ভেঙ্গে চৌচির হতে থাকে। বোবা চোখে চেয়ে থাকে কায়সার। দেখতেই থাকে। দুচোখে তার কী যে মায়া, কী যে যাদু। আমি অবশ হয়ে যেতে থাকি। ভুলে যাই, অন্যের বাসর ঘরে বসে আছি আমি। ভুলে যাই, যে কোনো সময় চলে আসতে পারে আমার স্বামী। আমার স্বপ্নের মানুষটাকে আমি অপলক দেখতে থাকি। এক সময় খুব মৃদুস্বরে বলে কায়সার,

– বেশ, চলে যাচ্ছি আমি। এ মুখ আর কোনদিন দেখবে না তুমি। তোমার সুখের জীবনে কোনদিন কাঁটা হতে আসব আর । শুধু যাবার আগে একটা জিনিষ চাইব, দেবে ?

শুনে গায়ে কাঁটা দেয়। কী চাইবে কায়সার ? এক সময় তাঁকে সব কিছু দেব বলে কি আকুল প্রতীক্ষা ছিল আমার। এখন, এই মুহূর্তে, মির্জা কৌশিক হায়দারের বাসর ঘরে বসে আমি খুব শঙ্কিত হয়ে পড়ি। কী করে ফিরাব তারে, যদি কিছু চায়? ভয়ে ভয়ে জানতে চাই,

– কী ?

– তোমার হাত দুটো একবার ছুঁতে দেবে ?

– ছুঁয়ে কী লাভ ?

– ঐ ছোঁয়াটুকুই লাভ। তোমার স্পর্শের স্মৃতিটুকু বুকে নিয়ে আমি কাটিয়ে দেব সারাটি জীবন। আর কিছু চাই না আমি। প্লিজ, না বোলো না।

কী যে হয় আমার ! কী যে ছিল কণ্ঠে ওর ! আমি আর না বলতে পারি না। মন্ত্রমুগ্ধের মত দুহাত বাড়িয়ে দিই। ও আলগোছে আমার হাত দুটি নিজ হাতে তুলে নেয়। কী যে থাকে সে হাতের ছোঁয়ায়। আমার হাত দুটি অবশ হয়ে যায়। আমার হাত দুটি নিয়ে ও শিশুর মতো আনমনে খেলা করে। আমার ভালো লাগে। ভীষণ ভালো লাগে। এরেই কি ভালোবাসার ছোঁয়া কয় ? কী এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে কেঁপে ওঠে আমার শরীর। কী এক আবেশে আমার চোখ মুদে আসে। এক অপূর্ব ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে আমি দুচোখ বন্ধ করি। আমার ভেতর থেকে কেউ একজন হাত সরিয়ে নিতে বলে। আমি সরাতে পারি না। হঠাৎ আমার চুলে, কপালে, চোখে গরম হাওয়া লাগে। আমি শুনতে পাই ঘন নিশ্বাসের শব্দ। খুব কাছে চলে আসে কায়সার। আমি চোখ খুলে দেখতে যাই। পাথর হয়ে আছে চোখে পাতা। আমি খুলতে পারি না। এক সময় তপ্ত নরম দুই ঠোঁটের ছোঁয়া অনুভব করি আমার কপালে। সে ছোঁয়ায় আমার কপাল পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। আমি শিউরে উঠে মাথা সরিয়ে নিতে যাই। কেউ যেন পেরেক মেরে আটকে রেখেছে মাথা জমিনে। একটুও নড়াতে পারি না। চিৎকার করে বলতে যাই, দোহাই তোমার, এভাবে আমাকে নষ্ট করো না। আমার গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হয় না। কী, হচ্ছে কী এ সব ? কেন করছে কায়সার এমন আমার সাথে? ও তো শুধু একটু ছুঁয়ে দিতে চেয়েছিল। রাগে, ঘৃণায় আমার গা রিরি করে ওঠে। আমি ধড়ফড় করে উঠে বসতে যাই। এক বিন্দু শক্তি নেই শরীরে। কাটা গাছের গুড়ির মতো ভারি মনে হয় শরীরটা। এ শরীরের উপর যেন আমার নিয়ন্ত্রণ নেই কোনো। বুঝতে পারি, নিয়ন্ত্রনহীন এ শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিতে উঠে আসছে আর একটা শরীর। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে তার। সে নিশ্বাসে এখন আগুনের হলকা। সে হলকায় জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে আমার চোখ, মুখ, গ্রীবা। ঠোঁটের ছ্যাকা ক্রমাগত নেমে যাচ্ছে নীচে, কপাল থেকে চোখে, চোখ বেয়ে নাকে, আরও নীচে। অসহায় আমি ছটফট করি। কষ্টে, দুঃখে, অপমানে, আমার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসে। এক সময় বলিষ্ঠ পুরু দুই ঠোঁট নেমে আসে ঠোঁটে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। হৃদপিণ্ডটা বুকের খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে চায়। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে আঁতকে উঠি। আমার ইজ্জত নিলাম হয়ে যাচ্ছে ভালোবাসার নামে ! ভাবতেই শরীরে শক্তি ফিরে আসে। দুহাতে তাঁকে প্রাণপণে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠি, -ছি ! নাহ !!

আমার চোখ খুলে যায়। তেমনই আলোকিত ঘর। বন্ধ ঘরের দরজা, জানালা। কোথায়ও নেই কায়সার। তাকিয়ে দেখি, ধাক্কা খেয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে, আমার সদ্য বিবাহিত পতি !

চলবে…।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ