পরকীয়া (পর্ব-৭)

প্রকাশিতঃ ৪:০৯ অপরাহ্ণ, সোম, ৬ জানুয়ারি ২০

ডা. আফতাব হোসেন :

জীবনে এতটা বিভ্রান্ত কখনও হয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। প্রচণ্ড শীতেও তখনও আমি ঘামছি আমি দরদর করে। কোথায় আমি ? বেশ কিছুটা সময় লেগে যায় বুঝতে আমার। গত ক’সপ্তাহ কায়সারের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে এক নতুন জীবন গড়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। কিছুক্ষণ আগেও সেই স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে, বাসর ঘরে পতির প্রতীক্ষা করতে করতে, কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। যাকে সচেতন ভাবে মন থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলাম, সে যে আমার অবচেতন মনের সবটা জুড়ে আছে বুঝতে পারিনি। সেই অবচেতন মনের জানালা খুলে এসেছিল কায়সার। বলতে এসেছিল, ভালোবাসি। যে শব্দটি শোনার জন্য ছিল অন্তহীন প্রতীক্ষা আমার। চেয়েছিল, একটু ছুঁয়ে দিতে। যে ছোঁয়ার কথা ভেবে ভেবে কত রাত ক্ষরণ হয়েছে বারবার। ভাবতেই শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। স্বপ্ন কখনও এতটা বাস্তব হয় ? এত জীবন্ত ? তখনই খেয়াল হয়, এখনও এলোমেলো হয়ে আছে আমার শাড়ি। সরে গেছে বুকের আঁচল। আমি ঝট করে শোয়া থেকে উঠে বসি। দ্রুত সামলে নেই প্রায় লুণ্ঠিত হয়ে যাওয়া আমার সম্পদ। হ্যাঁ, সম্পদই তো ! কি প্রেমিক, কি স্বামী, সব পুরুষেরই বুঝি নারীর এই সম্পদের প্রতি থাকে লোলুপ দৃষ্টি ! কি স্বপ্নে, কি বাস্তবে, শেষ পর্যন্ত সেদিকেই বাড়িয়ে দেয় হাত ! ভাবতেই একটু আগের সুখ শিহরণ এক অস্বস্তিতে ছেয়ে যায়।

আমি অবাক হয়ে ভাবি, সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত, আপাত মার্জিত একটা মানুষ রাতের আঁধারে এতটা অমার্জিত হয়ে যায় কেমন করে ? এ কেমন নিয়ম পুরুষ রচিত এই সমাজের ? শুধু মন্ত্রের জোরেই একটা নারীর শরীর তাঁদের কাছে বৈধ হয়ে যায় ? মনের দখল নেয়ার আগেই শরীরের দখল নিতে চায় ? ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন আমার জেগে দেখা স্বপ্নকে ভেঙ্গে চৌচির করে দেয়। স্বপ্নের ভেতর কায়সারের ছোঁয়া ভেবে যে শরীরে আমার সুখের বান ডেকেছিল, কৌশিকের ছোঁয়ায় সে শরীর আমার এখন অচ্ছুৎ মনে হয়। রিরি করে ওঠে। শুয়ে শুয়ে তখনও হাঁপাচ্ছিল মির্জা কৌশিক হায়দার। মুখে একটু বোকা বোকা হাসি, চোখে কেমন ঘোর লাগা দৃষ্টি। দেখে আমার গা জ্বলে যায়। সে আগুন ঝরে গলায়,

– আপনি কখন এসেছেন ?

– এই তো কিছুক্ষণ।

– আমাকে জাগালেন না কেন ?

– সারাদিন তোমার অনেক ধকল গেছে। তাই জাগাইনি। তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। আদর করার লোভটা সামলাতে পারিনি।

কেমন নির্বিকার অনুশোচনা-হীন জবাব কৌশিকের। যেন এটা কোনো ব্যাপারই না। হ্যাঁ, ঘুমন্ত স্ত্রীকে তার স্বামী আদর করতেই পারেন। তাই বলে প্রথম রাতেই ? জানা শোনা হবার আগেই ? তাও আবার বাতি জ্বালিয়ে? আমি হিস হিস করে উঠি,

– আমার মতামত নেয়ার প্রয়োজনও মনে করলেন না ?

– মতামত নিতে হবে কেন ? তুমি তো আমার বিয়ে করা স্ত্রী।

তেমনই নির্বিকার কণ্ঠে বলে কৌশিক। বিয়ে করা স্ত্রী মানে কী? বিয়ে না করা স্ত্রীও আবার আছে নাকি? কী জবাব দেব এর? যে মানুষটার বোধেই নেই যে মেয়েদেরও আত্মসম্মান বোধ আছে। আছে মতামত দেয়ার অধিকার। একজন নারীকে ছোঁয়ার আগে তার অনুমতি নিতে হয়। যে হয়ত জানেই না, সৃষ্টিকুলে ফুল ও নারী সব চেয়ে সুন্দর আর স্পর্শকাতর উপহার বিধাতার। এদেরকে যত্নের সাথে পরিচর্যা করতে হয়। নইলে অকালেই ঝরে যায় কিংবা মরে যায়। এমন মানুষকে কী বলব আমি ? যার কথা ভেবে গলায় আবার সুর তুলব ভেবেছিলাম, তাঁকে দেখে এখন আমার গলার স্বরটাও মরে যায়। কিছু না বলে আমি ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকি।

– অনেক রাত হয়েছে। আমার ঘুম পাচ্ছে। তুমি কাপড়টা বদলে তাড়াতাড়ি এসো।

ইঙ্গিতটা প্রচ্ছন্ন হলেও স্পষ্ট। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ক্ষুধার্ত বাঘ মানুষের মাংসের স্বাদ নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। এটাই স্বাভাবিক। আর পাঁচটা নব বঁধুর মতো নিজেকে সমর্পণ করার জন্য আমিও আমার মনটাকে প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। কিন্তু কৌশিক চোরের মতো আমার অগোচরে আমারই শরীরের দখল নিতে যেয়ে আমার সেই মনটাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। মরা মন নিয়ে এই শরীর জাগবে না আজ কিছুতেই। আমি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলি,

– আমি বাতি নিভিয়ে দিচ্ছি। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।

– তুমি ঘুমাবে না ?

– না, আমার এখন ঘুম আসছে না।

– তাহলে এসো।

বলে দু’হাত বাড়িয়ে এবার সরাসরি আমন্ত্রণ জানায় সে। তাঁর এই অশালীন আমন্ত্রণে শিউরে উঠি আমি। তবু না বোঝার ভান করে বলি,

– মানে ?

– তোমার মতো মেয়েদের মানে না বোঝার তো কথা নয়।

“তোমার মতো মেয়ে” মানে কী? এবার আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। আমি কি দেহ পসারিণী ? ভাত কাপড় দেবে বলে চাহিবা মাত্র শরীর দিতে বাধ্য থাকব? রাগে, অপমানে আমার শরীর শক্ত হয়ে যায়। তাঁর কথার জবাব দিতেও আমার ঘৃণা হয়।

এ কী করলাম আমি? অভিমান করে জেদের বশবর্তী হয়ে এমন একটা মানুষকে বিয়ে করলাম, যে আসলেই একজন মানুষ কিনা আমার সন্দেহ হয়। মানুষের মুখোশের আড়ালে প্রতিটা পুরুষই কি এমন পশু স্বভাবের হয় ? আমি ছোবল মারার জন্য সাপের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাই। দেখি উসখুস করছে। মুখে সেই বোকা বোকা হাসি। আমার মনের ভেতর কী চলছে, ধারণাও নেই তাঁর। লোকটার উপর রাগের চাইতে এবার করুণা বেশি হয়। মনে মনে বলি, দেবতারা চেনেনি যারে, তুমি কী চিনিবে তারে ? বিধাতা নারীকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল করে তৈরি করলেও অনেক ছলা কলা শিখিয়ে পাঠিয়েছেন দুনিয়ায় । নিজের সাথে নতুন করে বোঝাপড়া করার জন্য আজ আমার সময় দরকার। অবলীলায় মিথ্যা অজুহাত দেখাই,

– আজ নয়। আমার শরীর খারাপ।

– ও !

ধপ করে নিভে যায় তাঁর চোখের আলো। যেন ক্ষুধার্ত বাঘের মুখ থেকে কচি মায়া হরিণটি ছিনিয়ে নেয়া হল। “বাতিটা নিভিয়ে দাও” বলে মুখে ঝামটা মেরে রাগ দেখিয়ে পাশ ফিরে শোয়। যেন ঐ কাজটি ছাড়া বাসর রাতে আর কিছু করার নেই। তাঁর এমন স্থূল রুচির পরিচয় পেয়ে চোখ ফেটে পানি বের হয়ে আসে আমার। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে বিছানা থেকে নামি। বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে আসা আমার কাপড় চোপড়ের লাগেজটা পড়ে আছে এক পাশে। খুলে রাতের কাপড় বের করি। ঘরের বাতি নিভিয়ে দেই। আমার জীবনের মতই ঘরটা কালো আঁধারে ঢেকে যায়। কৌশিক অন্য দিকে ফিরে শুয়ে আছে। চাইলে আমি এই অন্ধকারেই কাপড় বদলাতে পারি। তাঁর দেখার কথা নয়। কিন্তু ভরসা পাই না। বাতির আলোয় যার হাত থেকে রেহাই পাইনি, অন্ধকারে তাঁকে ভরসা করি কেমন করে ?

আমি ওয়াশ রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেই। সুইচ অন করতেই উজ্জ্বল আলোয় ভরে যায় বেশ বড়সড় রুমটা। এক পাশে দেয়াল জোড়া আয়না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে দেখি। কনের সাজ লেপটে গেছে আদর নামের অপমানে। হঠাৎ অনুভব করি জ্বলছে আমার সমস্ত মুখ। যেন একটু আগেই এক জোড়া জোঁক রক্ত চুষে বেড়িয়েছে আমার সমস্ত মুখে। ঘিনঘিন করে ওঠে শরীর। আমি খুলে ফেলি সব ঘহনা। প্রাণপণে ঘষে তোলার চেষ্টা করি অপমানের সব স্পর্শ। ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা মারি চোখে, মুখে, গলায়। তবু জ্বালা জুড়ায় না। উল্টো সে জ্বালা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত শিরায় শিরায়। আমি একে একে খুলে ফেলি শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া, অন্তর্বাস। এই প্রথম পূর্ণ নিরাভরণ নিজেকে দেখি। বাইশটি বসন্তে ফুলে ফলে সাজিয়েছি যে বুকের বাগান, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি, ভালোবাসা-হীন স্পর্শে তার হবে এমন অপমান। আমি শাওয়ার ছেড়ে দিই। শীতের রাতে উদোম শরীরের ভাজে ভাজে ঠাণ্ডা পানির স্রোত যেন হুল ফুটিয়ে দেয়। আমি পরোয়া করি না। আমি ভিজতে থাকি। ভিজতেই থাকি। যতক্ষণ না শরীরে অসহ্য কাঁপন ধরে যায়। আমি কাঁপতে কাঁপতে শোয়ার কাপড় পরে নিই। তার আগে, প্রয়োজন নেই, তবু নিজেকে সুরক্ষা বন্ধনীতে বেঁধে নিই। শব্দ করেই বলি, মূর্খ পুরুষ, তোমরা জান না, ভালোবাসা পেতে নারী হৃদয় যতটা ব্যাকুল, ছলনা করতে তার মন ততটাই কুটিল !

ঘরে এসে দেখি বীর বিক্রমে, নাসিকা গর্জনে, লেপ মুড়ি দিয়ে, অঘোরে ঘুমচ্ছেন আমার স্বামী। অবাক হয়ে দেখি, থেকে থেকে কেঁপে উঠছে তার শরীর। লেপের নীচে ঠাণ্ডা তো তাঁর লাগার কথা নয়। তবে কি জেগে থেকে যা পারেননি, ঘুম ঘোরে স্বপ্নেই করছেন সেই অসাধ্য সাধন ? ভাবতেই আমার বমি এসে যায়। ঐ লেপের নীচে ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না। আমি খুঁজে পেতে একটা চাদর বের করে গায়ে দিয়ে খাটের এক কিনারে শুয়ে পড়ি। ঠাণ্ডা রাতে অসময়ে গোসল করে একটা চাদরে আমার শীত মানে না। কী অদ্ভুত ভাবে শুরু হল স্বপ্নের আমার বাসর ! একজন স্বপ্ন ভঙ্গের স্বপ্ন পূরণে ব্যস্ত স্বপ্নের দুনিয়ায়। আর একজন স্বপ্ন ভঙ্গের জ্বালা নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটায়!

সে রাতে কতগুলো ব্যাপার আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। চাইলেই কাউকে ভুলে থাকা যায় না। আমরা ভুলে থাকার ভান করতে পারি মাত্র। শরীর, সম্পদ, সামাজিক অবস্থান, একটা মানুষের যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। কি স্বপ্নে, কি জাগরণে, যতবার কৌশিক এসে দাঁড়াবে সামনে আমার, ততবারই কায়সার এসে দাঁড়াবে পাশে তাঁর। আর ততবারই কৌশিক হেরে যাবে কায়সারের কাছে মন ও মানসিকতায়, চিন্তা ও চেতনায়, প্রণয়ে ও ভালবাসায়। এমন একজন পরাজিত মানুষের সাথে সারাটা জীবন কী করে কাটাব আমি ? আমি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। অহেতুক অভিমানে যে ভুল আমি করেছিলাম, একবার শেষ বারের মতো চেষ্টা করে দেখি, সে ভুল শোধরানো যায় কিনা। সে ভুল শোধরাতে যদি কায়সারের কাছে আমার হেরে যেতেও হয়, সেও ভালো। সব অভিমান ভুলে আমি প্রথম ও শেষ বারের মতো কায়সারের মুখোমুখি হবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সম্ভবত শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই বেলা করে ঘুম ভাঙ্গে আমার। নতুন বউ। বেলা করে ঘুমিয়েছি। বাড়ির মেয়েরা আমাকে দেখে মুখ টিপে হাসে। কেউ কিছু বলে না। আত্মীয় স্বজনে গমগম করছে বাড়ি। লজ্জায় আমি মরে যাই। কৌশিককে কোথাও না দেখে আমি হাফ ছেড়ে বাঁচি। কাল রাতের ঐ ঘটনার পর আজ সামনা সামনি হতে ভীষণ অস্বস্তি হত আমার। এক ননদী জানাল, ভিসা সংক্রান্ত কারণে কৌশিক বাইরে গেছে। ফিরতে একটু দেরি হবে। বাহ! যত দ্রুত সম্ভব এই তস্কর আমাকে সাত সমুদ্রে তের নদীর ওপারে নিয়ে ফেলতে চাইছে। এক অজানা আশংকায় আমি শিউরে উঠি। যা করার আমাকে দ্রুত করতে হবে। এদিকে নীচ থেকে শাশুড়ি ডাকছেন। আমাকে তৈরি হয়ে নীচে যেতে হবে। আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের সামনে পুতুল সেজে বসে থাকতে হবে। তাঁদের কথার মিষ্টি হেসে জবাব দিতে হবে। বিবাহিতা মহিলাদের অশ্লীল ইঙ্গিতে লজ্জায় লাল হতে হবে। ভাবতেই আমার গায়ে জ্বর এসে যায়।

কায়সারের প্রতি আমার দুর্বলতার কথা কেউ জানত না একমাত্র স্নিগ্ধা ছাড়া। আমার সাথেই পড়ে। সেই স্কুল জীবন থেকে। বারবার নিষেধ করেছিল, বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত যেন জেদের বশবর্তী হয়ে না নিই। ওর কথা আমি শুনিনি। সে কি শুধু কায়সারের প্রতি অভিমানে ? নাকি উচ্চাভিলাষী জীবনের হাতছানি ছিল বলে ? আমি সত্যি জানি না। শেষ পর্যন্ত আমি সেই স্নিগ্ধাকেই ফোন করি।

– কায়সার কোথায় থাকে জানিস ?

– কেন ?

– ওর সাথে আমি কথা বলতে চাই। দেখা করতে চাই।

– কেন ? এক রাতেই মোহ ভঙ্গ হয়ে গেল ?

স্নিগ্ধার কণ্ঠে বিদ্রূপের হুল। আমি হজম করে যাই। আবার জিজ্ঞেস করি,

– তুই জানিস কিনা বল ?

– দেখা করে কী করবি ? বিয়ের খবর তো কাউকে দিসনি। এবার কি বরের তরফ থেকে বউ ভাতের দাওয়াত দিবি ?

– আমি সিরিয়াস স্নিগ্ধা।

– আমিও সিরিয়াস। দেখ অহনা, জীবনটা পুতুল খেলা না। অনেক হয়েছে তোর খামখেয়ালিপনা। এবার ক্ষান্ত দে। নিজেও শান্তিতে থাক। অন্যকেও শান্তিতে থাকতে দে।

– স্নিগ্ধা ! তুই সব কিছু জানলে এভাবে বলতে পারতি না।

– আমার তো সব কিছু জানার দরকার নেই। তুমি সুলতানা রাজিয়া নও যে সবাইকে তোমার দরবারেই এসে হাজির হতে হবে। ছেলেমানুষি জেদ করে আর কোনো পাগলামি করিস না, প্লিজ।

রেগে মেগে বলে স্নিগ্ধা। ওর এই রাগের যথেষ্ট কারণও আছে। ছোট বেলা থেকেই চেনে ও আমাকে। জানে কতটা জেদি আমি। একবার সিদ্ধান্ত নিলে সেখান থেকে আমাকে আর সরানো যায় না। আমিও জানি এত জেদ ভালো না। তবু বারবার আমি আমার জেদের কাছেই হেরে যাই। বাধ্য হয়ে ওকে খুলে বলি সব । কেন কৌশিককে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম আর কেনই বা এখন কায়সারকে খুঁজছি। সব শুনে ও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। কোনো মন্তব্য করে না। শুধু বলে, দু এক দিনের মধ্যেই কায়সারের খোঁজ এনে দেবে।

আমি তৈরি হয়ে নীচে নামি। সারাদিন এত মানুষের ভিড়ে, এত সামাজিকতা আর আনুষ্ঠানিকতার মাঝে আমার মন জুড়ে থাকে শুধু কায়সার। কী এক দোদুল্যমনতায় দোলে মন। কী এক অপরাধ বোধে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। আমার বিবেক বলছে, যা ভাবছি, যা করতে চাইছি, তা ঠিক নয়। আর মন বলছে, একটাই তো জীবন, কেন সারাটা জীবন কষ্ট পাব ? আমি সারাদিন স্নিগ্ধার ফোনের অপেক্ষায় কান খাড়া করে থাকি। কিন্তু ফোন আর আসে না।

সন্ধ্যার পর ফেরে কৌশিক। তখন আমি মেয়ে মহলে। সেও ফ্রেশ হয়ে ছেলে মহলে চলে যায়। আমি স্নিগ্ধার ফোন না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠি। তবে কি কায়সারের খোঁজ পেল না? খুব দায়িত্বশীল মেয়ে স্নিগ্ধা। খোঁজ পেলে অবশ্যই জানাবে। রাতে ছেলেরা আগে খেয়ে নেয়। কৌশিক খেয়ে উপরে চলে যায়। মেয়েদের খাবার পরও গল্প করার বাহানায় আমি নীচে যাই। কৌশিকের সাথে মুখোমুখি হবার ইচ্ছে নেই আমার। কিন্তু মেয়েরা আমাকে জোর করেই উপরে পাঠিয়ে দেয়। আমি দুরুদুরু বুকে উপরে উঠি। উঠতে উঠতে নিজের প্রতিরক্ষা বেষ্টনীকে স্পর্শ করি। আমার অনিচ্ছায় এ বেষ্টনী ভাঙ্গতে পারবে না কেউ।

ঘরে ঢুকতেই দেখি অন্ধকার হয়ে আছে ঘর। তবে কি কৌশিক ঘরে নেই ? আমি বাতি জ্বালাতে যেতেই শুনি কৌশিকের গলা,

– লাইট জ্বালিও না। খুব মাথা ধরেছে।

চোখে অন্ধকার সয়ে আসতেই দেখি বিছানায় শুয়ে আছে কৌশিক। ঘর অন্ধকার করে আছে কি শুধু মাথা ধরেছে বলে নাকি কালকের আচরণের পর লাইটের আলোয় আমার চোখে চোখ মেলাতে পারবে না বলে ? লোকটার তাহলে চক্ষুলজ্জাও আছে ? আমি কোনো কথা না বলে ওয়াশ রুমে চলে যাই। কাপড় বদলে ফিরে এসে দেখি তেমনই শুয়ে আছে কৌশিক। আমাকে দেখে বলে,

– আমার মাথাটা একটু টিপে দেবে ?

এখনও তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী আমি। এতটুকু সেবা তো স্ত্রীর কাছে চাইতেই পারেন। আমি না করতে পারি না। মাথার কাছে বসে তাঁর কপালে হাত রাখি। এই প্রথম আমি তাঁকে আমি স্পর্শ করি। সে স্পর্শে আমার শরীরে কোনো শিহরণ জাগে না। সে স্পর্শে কোনো ভালোবাসা থাকে না। আমি যন্ত্রের মতো তাঁর কপাল টিপে দিতে থাকি। কোনো কথা বলি না। এক সময় কৌশিক বলে,

– তোমার ভিসাটা হয়ে গেছে। এক সপ্তার মধ্যেই আমরা ইংল্যান্ড যাচ্ছি। তুমি গোছগাছ শুরু করে দাও।
স্বাভাবিক নিয়মে যে কোনো মেয়ের এই খবরে খুব খুশি হবার কথা। বিয়ের পরপরই একেবারে স্বপ্নের দেশ ইংল্যান্ডে যাওয়া, ক’জন মেয়ের ভাগ্যে হয় ? অথচ আমি খুশি হতে পারি না। চুপ করে থাকি। কৌশিক একটু অ-সহিষ্ণু কণ্ঠে জানতে চায়,

– কথা বলছ না কেন ? এ বিয়েতে কি তুমি খুশি নও ?

কী জবাব দেব? আমার মতেই তো বিয়ে হয়েছে। হতে পারে কাল রাতে লোকটা উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে একটা ভুল করে ফেলেছে। হতে পারে তাঁর আচরণ ছিল কিছুটা শিষ্টাচার বহির্ভূত। আমার আচরণও কি ভালো ছিল ? এক ধরণের অনুশোচনা জাগে মনে। মনে মনে বলি, খুশিই তো হতে চেয়েছিলাম। তুমিই তো হতে দিলে না। কিন্তু এ কথা তাঁকে বলতে পারি না। সব সত্য সব সময় বলা যায় না। মিথ্যে করে হলেও কৌশিকের মন রাখতে বলি,

– খুশি হব না কেন ?

ভেবেছিলাম, এ কথা শুনে খুশি হবে কৌশিক। ভেবেছিলাম, কাল রাতের আচরণের জন্য ক্ষমা চাইবে সে। ভেবেছিলাম, কাল রাতে যে কথাগুলো হয়নি বলা, আজ বলবে সে। ভেবেছিলাম, এক সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখাবে। ভেবেছিলাম, স্বপ্নের কায়সারকে বাস্তবের কৌশিক আজ হারিয়ে দেবে। আমার সব ভাবনায় ছাই দিয়ে কৌশিক বলে ওঠে,

– কতদিন চলে তোমার ?

– কী?

বুঝতে না পেরে অজান্তেই প্রশ্ন করি।

– মাসিক।

আমি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারি না। ছি ! শব্দের কী ছিরি ! মাসিক ! আর কোনো শব্দ পেলো না ? এখনও তাঁর মাথায় শুধু ওই একই চিন্তা ? শুনেছি, পুরুষের মনটা বুকের নীচে থাকে। তাই বলে এত নীচে ? মুহূর্তে কৈশিকের প্রতি একটু আগে জমা হওয়া সহানুভূতির মেঘ দূরে মিলিয়ে যায়। আলগোছে হাতটা কৌশিকের কপাল থেকে সরিয়ে নিই। যে জানেই না, মনের দরজা খুলেই শরীরের ঘরে প্রবেশ করতে হয়, তাঁকে স্পর্শ করতেও রুচিতে বাঁধে আমার। কেটে কেটে বলি,

– সময় হলে আমি জানাব। এখন ঘুমান।

চলবে…।

 

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ