পরিবেশবান্ধব মসজিদের ধারণা ও বাস্তবতা

প্রকাশিতঃ ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ, শুক্র, ৩ জানুয়ারি ২০

ড. মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ :

পরিবেশবান্ধব মসজিদ বলতে ওই মসজিদগুলোকে বোঝানো হচ্ছে যা প্রকৃতি এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক নয় বরং উপকারী। এসব মসজিদের পরিবেশ শুধু স্বাস্থ্যসম্মত তা নয় বরং তা পরিবেশ রক্ষায় যেমন ভূমিকা পালন করে তেমনি টেকসই উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। মসজিদ দুভাবে পরিবেশবান্ধব হতে পারে। ১. মসজিদের গঠন ও পরিবেশগত অবকাঠামোর দ্বারা এবং ২. গণসচেতনতার মাধ্যমে।

পরিবেশগত গঠন ও অবকাঠামো

এ ক্ষেত্রে মসজিদের অবস্থান ও তার পরিবেশ মুখ্য ভ‚মিকা পালন করে। অর্থাৎ মসজিদের অবস্থান ও তার পরিবেশ অবশ্যই এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে যা পরিবেশের জন্য উপকারী হবে। নিম্নলিখিত পন্থায় এটি নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে :

১. মসজিদের অবস্থানটি এমন হওয়া দরকার যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের পাশাপাশি প্রাকৃতিক একটা পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ দিকটা খোলামেলা রাখা গেলে কিংবা মসজিদের চারপাশে পর্যাপ্ত জায়গা রেখে মসজিদের বিল্ডিংটা গড়ে তোলা যেতে পারে। এমন না যে, মসজিদের জন্য বরাদ্দকৃত পূর্ণ অংশটুকুই মসজিদের ঘর নির্মাণ করতে হবে। বরং কিছু অংশ খোলামেলা রেখেও পূর্ণ জায়গাটুকু সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তা ছাড়া মসজিদের ছাদটিও যদি এমনভাবে ডিজাইন করা যায় যে, আলোর প্রতিসরণ উপযোগী তাহলেও পর্যাপ্ত আলো পাওয়া যাবে।

২. মসজিদের চারপাশে বনজ ও ফলজ উভয়ই গাছ লাগানো যেতে পারে। লাগানো যেতে পারে বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছও যা শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা নয় বরং সৌন্দর্যবর্ধনেও কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারবে। তা ছাড়া পরিবেশ যত সুন্দর হবে, মুসল্লিদের ইবাদতে ততই মনোযোগ আকর্ষণ করবে। নামাজ আদায়ের পরেও তখন তারা চাইবে কিছুটা অবসর সময় সেখানে অতিবাহিত করতে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের আশপাশে যদি জায়গা নাও থাকে, তবুও মসজিদের প্রবেশ পথে, ছাদে, জানালার ধারেও কিছু গাছ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শহরগুলোতে এখন তো ছাদবাগান বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চিন্তা করুন, মসজিদের ছাদে যদি কিছু গাছ থাকে তাহলে ভেতরের পরিবেশ গরমের সময় যেমন ঠান্ডা হবে, তেমনি শীতের সময়ে গরম অনুভূত হবে। এটি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ীও হবে। অন্যদিকে, কোরআনে বর্ণিত জান্নাত (বাগান)-এর একটি সাদৃশ্য ও তদীয় চিত্র তুলে ধরতেও সাহায্য করবে। ফলে, মসজিদের প্রতি একটা অন্যরকম আকর্ষণও গড়ে উঠবে।

৪. সোলার প্যানেল ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব। তা ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে এটি বেশ সাশ্রয়ী।

৫. মসজিদের বিল্ডিংগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা যেতে পারে যাতে বৃষ্টির পানিকে সংরক্ষণ করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে ঢাকা শহরে যে বিশুদ্ধ খাবার পানির দুর্ভোগ আমরা লক্ষ্য করি, বিশেষ করে গ্রীষ্মের সময় তা থেকে উত্তোরণের উপায় হতে পরে এটি। পাশাপাশি অজু-গোসলসহ বাগানের গাছগুলোতেও পানির যোগান দেবে।

৬. সাউন্ড সিস্টেমও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া জরুরি। এমন অনেক মসজিদে নামাজ আদায় করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেখানে সাউন্ড সিস্টেম ভালো না থাকার কারণে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। খতিব সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোও শোনা যায় না। এমনকি খুতবা পরবর্তীতে নামাজেও মনোযোগ থাকে না বিশ্রী শব্দের জন্য।

গণসচেতনতার মাধ্যমে

গণসচেতনতার যতগুলো উপায় আছে তা একটি মসজিদ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে। পৃথিবীতে এমন আর একটিও জায়গা নেই যেখানে মানুষ নিজ ইচ্ছায় এসে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে বক্তার কথাগুলো শুনেন। সুতরাং যে কাজগুলো এখানে করা যেতে পারে তা হলো

১. বক্তব্যের বিষয়ে পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি ইসলামী শিক্ষাগুলো তুলে ধরা যায়। তুলে ধরা যায় সে ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় এবং বর্জনীয় কী। ফলে প্রত্যেক মুসল্লিই প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হবেন, যা সুন্দর একটা প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের উপহার দিতে পারে। মসজিদের বাইরেও তার ঘরে ঘরে গাছপালা, বাগান গড়ে উঠতে পারে, গড়ে উঠতে পারে প্রত্যেক বাড়িই একটি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের উদাহরণ।

২. কথা নয় কাজের মাধ্যমে উদাহরণ সৃষ্টির অনুপম সুযোগ হবে একটি মসজিদের। একটি মসজিদ যখন প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করবে তখন শুধু তত্ত¡কথায় নয় বরং বাস্তবিকই প্রকৃতির প্রতি বিশেষ ভালোবাসা গড়ে উঠবে প্রত্যেক মুসল্লিদের মাঝে।

৩. মসজিদ সংলগ্ন বাগান কিংবা সুন্দর পরিচ্ছন্ন জায়গাটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজ ও উৎসবের জন্যও উন্মুক্ত থাকতে পারে। যেখানে নামাজের উদ্দেশ্যের বাইরেও অন্যান্য সময় এমন একটি পরিবেশে সমাজের মানুষ কাটাতে পারবে যেখানে কোনো বেহায়াপনা নেই, নেই অসামাজিক কোনো কার্যক্রম। সুন্দর একটি পরিবেশে এসব কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে তারা ইসলামিক বিধান-ব্যবস্থাপনার প্রতি আরও আকৃষ্ট হবে এটাই স্বাভাবিক। হতে পারে সংস্কৃতির বন্ধনের অনুক‚ল পরিবেশ এটি।

৪. ছোট সোনামনিদের অবাধ বিচরণের স্থান হবে মসজিদ সংলগ্ন এই বাগানটি। আজকাল পিতা-মাতা তার সন্তানের হাত ধরে সুন্দর সকাল কিংবা ক্লান্ত বিকালে কোনো পার্ক কিংবা বিনোদন কেন্দ্রে যাওয়াটা অনেকেরই রুচিতে বাধে শুধু সেখানকার পরিবেশের কারণে। ছোট হৃদয়ের অধিকারীরা কী শিখবে এখান থেকে? ফলে এ কাজটিই আর করা হয়ে ওঠে না। কিন্তু চিন্তা করে দেখুন যদি মসজিদ সংলগ্ন কিছু জায়গা যদি এমন একটি মহৎ কাজে লাগাতে পারি তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে উঠবে সুন্দর একটা মনমানসিকতা নিয়ে। তারাও প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি আন্তরিকতা নিয়ে তা সংরক্ষণ করার প্রতি মনোযোগী হবে। যা টেকসই প্রকৃতি ও পরিবেশ গড়ে তোলার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ এগুলো সব তখনই সম্ভব হবে, যখন পুরো মসজিদের ডিজাইন এমন কোনো প্রকৌশলীর দ্বারা করা হবে, যিনি আধুনিক স্থাপত্য সম্পর্কে যেমন অবহিত হবেন, তেমনি দক্ষতা থাকবে ইসলামী স্থাপত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে। তা না হলে, এটি অর্জন করা কখনও সম্ভব হবে না।

আসলে মসজিদ মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখানে প্রত্যেকদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি জুমার নামাজের জন্য ওই এলাকার অধিকাংশ মুসল্লিরা যেয়ে থাকেন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মসজিদ আছে।

এই মসজিদগুলো যদি সত্যিকার অর্থে প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব করা যায় তাহলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্যি যে, এ বিষয়গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। সুতরাং আমাদের পরামর্শ হলো, নতুন কোনো মসজিদ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই এ বিষয়গুলোকে নিশ্চিত করতে পারেন। ঢাকা শহরে যেমন যেকোনো বিল্ডিং করতে গেলে রাজউকের অনুমতি লাগে, তেমনি মসজিদ করার ক্ষেত্রের তাদের অনুমতির জন্য উপরোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যই নিশ্চিত করা জরুরি। গ্রামাঞ্চলেও এটি বাস্তবায়ন করা যায় সহজে। শুধু দরকার একটু সচেতনতা। সে ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ্য, গত রমজান মাসে (২০১৯) ইউরোপের প্রথম ইকো-মসজিদ উদ্বোধন করা হয় অক্সফোর্ড, লন্ডনে। এটি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ