পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরাই আজ এগিয়ে

প্রকাশিতঃ ৩:১২ অপরাহ্ণ, শনি, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০

মো: মঈন উদ্দিন রায়হান : ময়মনসিংহ শহরের উল্টো দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে চরকালিবাড়ী এলাকা। যেখানে বসবাস করে বেশ কিছু দরিদ্র পরিবার। এসব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের অভিভাবক কেউ রিক্সা চালক, কেউ ভ্যান চালক, দিনমজুর, গাড়ীর হেলপার, কেউ আবার মানুষের বাড়ীতে বুয়ার কাজ করে সংসার চালায়। কিছু ছেলে-মেয়ে এতিম।

যাদের পক্ষে পরিবারের খাবার যোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের পক্ষে লেখা-পড়ার চিন্তা করাটাই কিন্তু ছিলো বিলাসিতার মতো। নানা কারণে অনগ্রসর এই এলাকার শিশুরা শিক্ষার সুবিধাবঞ্চিত ছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু এই এলাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলো, যার নাম ‘ঘাসফুল শিশু নিকেতন’। যেই স্কুলে সমাজে পিছিয়ে পড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠদান করানো হয়। বর্তমানে এই স্কুলের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরাই আজ এগিয়ে যাচ্ছে।

২০১৯ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর (পিইসি) পরীক্ষায় তাদের সাফল্য সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। সেই পরীক্ষায় স্কুলের মোট ২২ জন অংশগ্রহণ করে ১৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাকিরা সবাই জিপিএ-৪ অর্জন করেছে। শুধু তাই নয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত প্রাথমিক বৃত্তির তালিকায় রয়েছে স্কুলের ৪ জন শিক্ষার্থীর নাম। স্কুলের শিক্ষার্থী রিমি, রাকিব, সুমাইয়া ও তোহফা সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। ২০১৪ সালে ‘ঘাসফুল শিশু নিকেতন এর যাত্রা শুরু। এখন পর্যন্ত এ স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭০ জন।

কয়েকজন তরণ-তরুণী স্কুলটি গড়ে তুলেছিল। তাদের চেনা পরিচয় ফেসবুক দিয়ে। এর মূল উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা মোঃ আখতারুজ্জামান যিনি জামান পায়েল নামেই পরিচিত। স্কুলটিতে সার্বিকভাবে যুক্ত আছেন একদল নিবেদিতপ্রাণ তরুণ স্বেচ্ছাসেবক।

পেশায় ওয়েব ডিজাইনার স্কুলের উদ্যোক্তা জামান পায়েল সময় জার্নালকে বলেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু একটা করার কথা তিনি প্রায়ই ভাবতেন। তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে পীড়া তিনি বোধ করতেন। ভাবতেন, পড়াশোনা হয়তো ওদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে পারে। নিজের স্বপ্ন আর ইচ্ছাগুলো তিনি ছড়িয়ে দিতে শুরু করলেন নিজের ফেসবুক পাতায়।

কিছু নিবেদিতপ্রাণ তরুণ-তরুণী লাইক দিয়ে, কমেন্ট দিয়ে যুক্ত হলেন তার সঙ্গে। তারপর ২০১৪ সালের ১০ জানুয়ারি মাত্র ২৫ জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলো স্কুলটির। তারপর আর পেছেনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি ও স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিকতায় স্কুলটি হয়ে উঠেছে এলাকার অহংকার।স্কুলের পাঠদান স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে পাঠদানের জন্য দুই শিফটে হয়ে থাকে। মর্নিং শিফট সকাল ৮টা থেকে ১২টা এবং ডে শিফট ১২ টা থেকে ৪ টা। সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস। আর শনিবার ছুটি।

শুক্রবার বিকেলে স্কুলের নিয়মিত ক্লাসের পর সকল স্বেচ্ছাসেবীরা ঘাসফুলে উপস্থিত থাকেন। এই সময় শিক্ষার্থীদের গানের ক্লাস এবং অন্যান্য কিছু বিষয়ের উপর স্বেচ্ছাসেবীরা অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে থাকেন। নিয়মিত পরীক্ষার বাইরে মাসিক পরীক্ষা হয় নিয়মিত।

এছাড়া প্রতি মাসেই শিশুদের শিক্ষা উপকরণ (খাতা, পেনসিল , ড্রয়িং খাতা, রং পেনসিল, শার্পনার, ইরেজার ইত্যাদি ) দেয়া হয়। সেই সাথে শিশুদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপর গুরুত্ব দিয়ে সাবান, টুথ-ব্রাশ এবং অন্যান্য উপকরণ দেয়া হয়। ঈদের সময় দেওয়া হয় সেমাই, নুডলস, চিনি, চাল। ঈদুল ফিতরে শিশুদের জন্য উপহার হিসেবে থাকে নতুন জামা-কাপড়। শীতে বিতরণ করা হয় শীতবস্ত্র। এছাড়া স্কুলের ড্রেসও বিনামূল্যে শিশুদের তৈরি করে দেয়া হয়।

ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে জামান পায়েল বলেন, ‘আমরা এ স্কুলটিকে ধাপে ধাপে দশম শ্রেণি পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণি থেকে কম্পিউটার ও চতুর্থ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা যুক্ত করার পরিকল্পনাও আছে। বর্তমানে ভাড়া একটি বাড়িতে স্কুলের কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। সরকার বা সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের নজরে এলে যদি নিজস্ব একটা জমি পাই, তবে কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং এলাকার বেকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সেই সাথে কারিগরী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

বর্তমানে স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছে অনলাইন এ্যাক্টিভিষ্টদের সামাজিক সংগঠন হিউম্যানিটাস সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টারের অধীন যার প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন লেখিকা বন্দনা কবির।

স্কুলটির অর্থ সংস্থান করছে অসংখ্য ফেসবুক বন্ধুরা এবং তুসুকা গ্রুপ, নভোএয়ার, পলিমার সলিউশন।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ঘাসফুলের তরুণদের স্বেচ্ছাশ্রম, অনুপ্রেরণা হতে পারে অন্যদের জন্যও।

সময় জার্নাল/

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ