বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব : মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হচ্ছে আজ

প্রকাশিতঃ ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ, রবি, ১২ জানুয়ারি ২০

সর্বশেষ হেদায়েতি বয়ান ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে আজ রোববার শেষ হচ্ছে তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে আয়োজিত বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। ইজতেমা সূত্র জানিয়েছেন, দুপুর ১২টার পর থেকে জোহরের নামাজের আগে যেকোনো সময় আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। মোনাজাত পরিচালনা করবেন তাবলিগ জামাতের শীর্ষ বুজুর্গ ও কাকরাইল মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ যোবায়ের।

বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে আগামী ১৭ জানুয়ারি। এ পর্বের আয়োজক বিশ্ব তাবলিগ জামাতের সাবেক আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা।

মোনাজাতের প্রস্তুতি : প্রতিবছর বিশ্ব ইজতেমার তিন দিনের কর্মসূচিতে যতসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে এর প্রায় দ্বিগুণ লোকের সমাগম ঘটে আখেরি মোনাজাতে। মোনাজাতে অংশ নিতে এরই মধ্যে টঙ্গীর প্রতিটি বাড়িঘর, কলকারখানা, কলোনি ও আশপাশের গ্রামগুলোতে আত্মীয়-স্বজন এসে হাজির হয়েছেন। আজ ফজরের নামাজের পর থেকেই হাজারো মুসল্লি ছুটছেন ইজতেমা মাঠের দিকে।

মোনাজাতে অংশ নিতে আগতদের অর্ধেকেরই ঠাঁই হয় মহাসড়ক, অলিগলি ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে। আর তাই হোগলাপাটি ও মাদুর এমনকি পুরনো খবরের কাগজেরও চাহিদা বেড়ে যায়। গতকাল থেকেই এসব সামগ্রী জোগান দেওয়ার জন্য খুদে ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে উঠেছেন। আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণকারীদের তৃষ্ণা মেটাতে কিছু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্য খাবার পানির ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ছাড়া টঙ্গী-গাজীপুর এলাকার প্রায় সব সড়কের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে নাশতার হোটেল। মোনাজাতে লাখ  লাখ মানুষের উপস্থিতির কারণে ইজতেমা ময়দান সংলগ্ন টঙ্গী  ও রাজধানীর উত্তরা এলাকার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান আজ বন্ধ রাখা হয়েছে।

এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে ৫১টি দেশের প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন বলে আয়োজক সূত্র জানায়। ইজতেমার দ্বিতীয় দিন গতকাল শনিবার তাবলিগের ছয় উসুলের আলোকে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা সংবলিত আমবয়ান পেশ করেন দেশ-বিদেশের বুজুর্গ মুরব্বিরা।

বাদ ফজর বয়ান করেন মাওলানা আব্দুর রহমান, বাদ জোহর বয়ান করেন মাওলানা ইসমাইল গোদরা, বাদ আসর বয়ান করেন মাওলানা জোহায়রুল হাসান, বাদ মাগরিব বয়ান করেন মাওলানা ইব্রাহীম দেওলা।

নজিরবিহীন কড়া নিরাপত্তায় এবারের ইজতেমা ছিল অত্যন্ত শান্ত ও সুশৃঙ্খল। প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল অনুকূল। গত দুই দিন শীত ও ঠাণ্ডা বাতাস থাকলেও বৃষ্টিপাত হয়নি।

প্রথম পর্বে আগের বছরগুলোর চেয়ে এবার মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেশি হয়েছে। যদিও এবার প্যান্ডেলের আয়তন বাড়িয়ে খেত্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রথম দিনই তুরাগ নদের দুই তীরের শামিয়ানা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন জেলা থেকে আসা জামাতবদ্ধ মুসল্লিরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, কামারপাড়া সড়ক, হোন্ডা সড়কসহ আশপাশের রাস্তায় ঠাঁই নিয়েছেন।

বিশ্ব ইজতেমা শেষে প্রথম পর্বে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের সবাই বাড়ি ফিরে যাবেন না। কয়েক হাজার নতুন জামাত দেশ-বিদেশে দাওয়াতে তাবলিগের কাজে ছড়িয়ে পড়বে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মেহমানদের অনেকেই বাংলাদেশে দাওয়াতের কাজে সম্পৃক্ত হবেন।

গত তিন দিন বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে দেশ-বিদেশের তাবলিগি মুরব্বিরা এশার নামাজ বাদ ছাড়া চার নামাজের পর ঈমান, আমল, আখলাক ও দ্বিনের মেহনত সম্পর্কে আম ও খাসবয়ান করেন। বয়ানে মুরব্বিরা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ, ইমানের পরীক্ষা, তাকওয়া অর্জনের পথ, কামিয়াবি হাসিল, জাহান্নামের শাস্তি থেকে পরিত্রাণের উপায়, দুনিয়াবি শাস্তি, আখেরাতের কামাই ও দাওয়াতে তাবলিগের গুরুত্ব সম্পর্কে উর্দু ভাষায় বয়ান করেন। এ সময় বিভিন্ন দেশের মেহমানদের বোঝার সুবিধার্থে তাত্ক্ষণিক বয়ান বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, চৈনিক, মালয়সহ বেশ কিছু ভাষায় অনুবাদ করে শোনানো হয়। ময়দানের বিভিন্ন স্থানে তাশকিল কামরা ও কাবুওয়ালি জামাত কক্ষে ছোট ছোট আয়োজনে পেশাভিত্তিক খাসবয়ান অনুষ্ঠিত হয়।

৫ মুসল্লির মৃত্যু : শুক্রবার রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত ইজতেমায় যোগদানকারী পাঁচ মুসল্লি বার্ধক্যজনিত কারণ ও হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁরা হলেন আব্দুর রাজ্জাক (৬৫) রাজশাহী, আব্দুল তমিজ (৬৫) কুমিল্লা, মোহাম্মদ শাহজাহান (৬২) ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আলী আজগর (৭০) বরিশাল ও ইউনুস আলী (৪৫) ময়মনসিংহ।

যৌতুকবিহীন বিয়ে : দুই বছর বন্ধ থাকার পর ইজতেমা ময়দানে আবার যৌতুকবিহীন বিয়ের আয়োজন করা হয়। প্রচলিত নিয়মানুসারে কনের সম্মতিতে ও বরের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের আয়োজনে তাবলিগ জামাতের মুরব্বিদের মধ্যস্থতায় দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকবিহীন বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শনিবার আসরের নামাজের পর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। মাগরিব পর্যন্ত শতাধিক বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মঞ্চের আশপাশে সমবেত মুসল্লিদের মধ্যে খুরমা খেজুর ও পানীয় বিতরণ করা হয়। মোহরে ফাতিমা নামের এই বিয়ের আয়োজনে মুরব্বিরা বিশেষ খুতবা পাঠ করেন।

কঠোর নিরাপত্তা : গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আনোয়ার হোসেন জানান, বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক নিরাপত্তা আগের মতোই বহাল থাকবে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মুসল্লিরা যাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন, সে ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন বিশেষভাবে প্রস্তুত রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা পরবর্তী ইজতেমায় দায়িত্ব পালনের জন্য টঙ্গীতেই অবস্থান করবেন।

তাবলিগ জামাতের বিবদমান দুই পক্ষের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষকে পৃথকভাবে ভিন্ন সময়ে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। মাওলানা যোবায়ের অনুসারীরা আমলি শুরার তত্ত্বাবধানে বিশ্ব ইজতেমার যাবতীয় প্রস্তুতিকাজ সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে মাওলানা সাদ কান্ধলভী অনুসারীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় মোনাজাতের পর সব অবকাঠামো খুলে তা সংরক্ষণ করার।

গত বছর থেকে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন এভাবেই চলছে। এর আগে বিভিন্ন দেশের মেহমানদের অংশগ্রহণে ৩২ জেলা করে দুই পর্বে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হতো। তাবলিগ জামাতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে বিশ্ব ইজতেমায় বিদেশি মেহমানদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে দুই ভাগ হয়ে গেছে।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ