বড় ভাইদের পরিচয়পর্বের নামে প্রতিদিনই চলছে নির্যাতন

প্রকাশিতঃ ১২:০৪ অপরাহ্ণ, শনি, ২৫ জানুয়ারি ২০

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলছি!

প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছি আমি, জানিনা কার কাছে সাহায্য চাইবো, তাই এখানে পোস্ট করছি।

আমি এ বছর এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টিতে এখানে ভর্তি হয়েছি। সংগত কারণেই ফেইক একাউন্ট থেকে পোস্ট করতে হচ্ছে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে “পরিচয়পর্ব” এর নামে প্রায় প্রতিদিনই নির্যাতন চলছে। আমাদের সবার মাথার চুল কেটে দেয়া হয়েছে একদম জিরো সাইজে। একদম সবার চুল জোর করে কেটে দিয়েছে।

বড় ভাইরা প্রতিদিন রাতে ২-৩ তার দিকে আমাদের গণরুমে আসে। কোনো কথাবার্তা নাই, হঠাৎ মাঝরাতে সবাই যখন ঘুমে তখন ধুমধাম শব্দ করে ৩০-৪০ জন থার্ড সেমিস্টার এর ভাই আমাদের গনরুমে ঢুকে প্রচণ্ড জোরে চিল্লাচিল্লি করে আমাদেরকে ঘুম থেকে তুলে ফেলে। কেউ অসুস্থ থাকলেও কোনো মাফ নাই। বড়ভাইদের কারো করো হাতে সিগারেট থাকে।

“পরিচয়পর্ব” চলে একদম ফজরের আযান পর্যন্ত। তারা আমাদেরকে যা যা নির্যাতন করে তার একটা নমুনা:

১. জানালার গ্রিল ধরে ঝুলিয়ে রাখে।
২. মাটিতে বুক লাগিয়ে “crawl” করায়।
৩. বাথরুমে আটকিয়ে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
৪. হাতে ইট নিয়ে দাড় করিয়ে রাখে।
৫. ১০০-৫০০ বার কানে ধরে উঠবস করায়।
৬. মাঝেমধ্যে ছাদে নিয়ে যায়। এরপর ছাদে পানির ট্যাংক এর নিচের শ্যাওলার মাঝে হামাগুড়ি দেয়ায়।
৭. শীতের মধ্যে মাঝরাতে ঠান্ডা পানি গায়ে ঢেলে দেয়।
৮. বড় ভাইদের রুমে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে পেট দিয়ে “সুপারম্যান” হওয়ায়।
৯. বড়ভাইদের রুমে নিয়ে গিয়ে তাদের বেডের মশারির এক কোনা খুলে হাতে ধরাই দিয়ে বলে সারারাত দাড়িয়ে থাকতে এটা ধরে।

আর কত ধরনের নির্যাতন যে চলে এর কোনো সীমা নেই।

শুধু যে রুমে আসে এরকমও না। গণরুম এর বাইরেও ওরা ওত পেতে থাকে। বাথরুমে যাওয়ার সময় বা অন্য কোনো কাজে বের হলেই (সকাল বিকাল রাত যেকোন সময়) ধরে নির্যাতন চালায় কমপক্ষে ১০-১৫ জন মিলে।

আরো নির্যাতন আছে। আমাদেরকে যা যা পড়তে দেয় না:
১. লেদার বা জিন্স এর জ্যাকেট
২. হুডি
৩. শু জুতা (শুধু দুই ফিতার জুতা পড়া যাবে)
৪. গোল গলা গেঞ্জি
৫. চাদর
৬. ঘড়ি
৭. মাফলার

শুধু শার্ট প্যান্ট পড়া যাবে আমাদের। বাইরেও নিষিদ্ধ পোশাক পড়া যাবে না। এই শীতেও অনেকেই যাদের কাপড়ের জ্যাকেট নাই বা হুডি আছে শুধু, আমাদের শুধুই শার্ট পরে চলাফেরা করতে হয়।

আমাদেরকে “রোবট” হয়ে থাকতে হয় হলের ভেতর এবং আশেপাশের এলাকায়। রোবট মানে হলো দুই হাত প্যান্টের সেলাইয়ের সাথে সমান্তরাল থাকবে, ভাবলেশহীন চেহারা থাকবে, প্যান্ট ভাজ করলে সেটা করতে হবে ভেতরের দিকে। এরকম অবস্থায়ই আমরা হলের ভেতর এবং বাইরে চলাফেরা করি।

যখন প্রভোস্ট স্যার বা অন্য কেউ আসে, খুব দ্রুত বড় ভাইরা সটকে পড়ে। প্রভোস্ট স্যারও সবকিছু জানে, তাই স্যার কখনোই রাতের বেলা হলে আসে না।
ভাইরা হলের বাইরে পাহারা দেয়। যখনই কেউ খোজ নিতে হলের দিকে আসে, তারা দ্রুত হলের ভেতরের ভাইদের জানাই দেয়।

অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে, কেউ কেউ বাইরেও চলে যাচ্ছে বাসা নিয়ে। বাইরে গেলেও শান্তি নাই, ক্লাসে গেলে সেখান থেকে ভাইয়েরা ধরে নিয়ে আসে হলে। চলে এক্সট্রা “ডোজ”। আমাদের অনেকেরই শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ছে রাত জেগে জেগে, সকালে প্রায়ই ক্লাস মিস করি আমরা।

প্লিজ, আমাকে কেউ বলেন আমি এখন কি করতে পারি? আমি সহ্যের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। অনেক আশা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। মাঝেমধ্যে নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করে। একটা মানুষ কতখানি সহ্য করতে পারে?

(এক সপ্তাহ আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন কে সাময়িক বহিষ্কার করছে এই নির্যাতন এর জন্য। তবুও কমে নাই আমাদের উপর নির্যাতন।)

আপডেট ১:
——————
আমাদের সমাবর্তন উপলক্ষে ১০ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ভার্সিটি বন্ধ থাকবে। আগে ১৫ জন বহিষ্কার এর কারণে এবং এখন এই ফেসবুক পোস্ট এর কারণে থার্ড সেমিস্টার এর ভাইয়েরা আমাদের উপর প্রচণ্ড রেগে আছে। শুনতেছি সমাবর্তন এর চাপ শেষ হলেই ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিশোধ হিসেবে আমাদের উপর প্রচণ্ড মাত্রায় নির্যাতন শুরু করা হবে।

প্লিজ, কেউ ভুলে যাবেন না আমাদের কথা।

আমি আমাদের সিনিওর যারা নির্যাতনে অংশ নেন তাদের নাম পরিচয় কালেক্ট করা শুরু করে দিয়েছি। আমার সাথে একটা সংবাদমাধ্যম থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং দোষীদের নাম পরিচয় জানতে চাওয়া হয়েছে।

যারা আমার পোস্টের সত্যতা নিয়ে সংশয়ে আছেন, সবার কাছে আর্জি রইলো দয়া করে কোনোভাবে ফার্স্ট সেমিস্টার এর একটা ক্লাসের ছবি কালেক্ট করেন। দেখেন, কার চুল কতো লম্বা। চেহারায় রাত জাগার ছাপ আছে কিনা দেখেন। হলের ভেতরের সিসি ক্যামেরাগুলোতে চেক করেন ছাত্রদের অবস্থা। সব প্রমাণ পেয়ে যাবেন।

আপডেট ২ (২৪ জানুয়ারি রাত ৯ টা)
———————————————–
আমাদের ক্যাম্পাসে খুব খারাপ অবস্থা এখন। বড় ভাইরা রুমে রুমে এসে বলে গেছে যাতে সবাই ক্যাম্পাসের বাইরের গ্রুপগুলো তে আমার এই পোস্টের বিরুদ্ধে পোস্ট দিতে থাকি। আমার দুইজন বন্ধুকে ধরে ও নিয়ে গেছে। অনেকে বাড়িতে গেছে বন্ধের সুযোগে, তাই আমাদের উপরই রাগ মিটাচ্ছে এখন। আমাকে কখন ধরবে, জানিনা!

আমি আমার ব্যাচমেটদেরকেই একরকম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে দিয়েছি। সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী সেজন্য।

তথ্যসূত্র : https://web.facebook.com/profile.php?id=100028874181447&__tn__=%2CdCH-R-R&eid=ARCJwk0QLA9o1aikYtqDIwodNB2A99MrIhJma3Kth8RYLNsgl1YtuJELIe7CtPwA83LVsK3c6adxuQb-&hc_ref=ARToo9hHEWJjLz3onVC3Mbg0xz76YsRWUikSGtlfQX2CIxqgERIkVupnPAH4wXECOnM&fref=nf&hc_location=group

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ