জাবিয়ানদের শিশুস্বর্গ :
ভাই খুব উপকার হইলো, ঈদের উপহার পেয়ে

প্রকাশিতঃ ২:৩৩ অপরাহ্ণ, শনি, ২৩ মে ২০

এস কে দোয়েলঃ

হ্যালো…হ্যালো… শিশুস্বর্গের কবীর আকন্দ বলছেন?.. ওপাশ থেকে কাতর কন্ঠে নারীর কন্ঠ।

জ্বি- কবির আকন্দ বলছি, কে বলছেন?

-ভাই, আমি জুবাইদা খাতুন বলছি, করোনা ভাইরাসের কারণে পোলাপান নিয়া খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। ঘরে খাবার নাই, পাথরের কাজ করি, তাও বন্ধ। সামনে ঈদ, কি করবো বুঝতে পারছি না।

-‘ঠিক আছে, আপনার ঠিকানা বলেন, খাবার পৌছে যাবে। ঠিক সন্ধ্যের মধ্যে চাল, ডালসহ খাদ্য সামগ্রী পৌছে গেল সেই অস্বচ্ছল নারীর ঘরে। ঈদের খাদ্য সামগ্রী পেয়ে নারীর আবার ফোন, ভাই খুব উপকার হইলো, ঈদের বাজার পেয়ে। এরকমই প্রতিদিন অস্বচ্ছল পরিবারদের ফোন। আস্থার ফোন। ফোন করলেই মিলবে কোন না কোন কিছু। এরকমই শিশুস্বর্গের কবীর আকন্দ কারো আস্থার ভাই, শিশুদের প্রিয় আংকেল আর সবার চোখে সাদামনের মানুষ।

দেশের উত্তর সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা। সীমান্তলগ্ন গ্রাম দর্জিপাড়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী কবীর আকন্দের হাত ধরে গড়ে উঠেছে শিশুস্বর্গ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে এ শিশুস্বর্গের সাথে যুক্ত হয় জাবিয়ান সাবেক শিক্ষার্থীরা।

চলমান বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা দূর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের গৃহিত পদক্ষেপে টানা লকডাউনে ঘরবন্ধী মানুষরা যখন খাদ্য সংকটে সম্মুখীন, তখন হতেই সীমান্তের এই আস্থার প্রতীক শিশুস্বর্গ শুরু করে খাদ্য সামগ্রী বিতরণের। নিজেদের সাধ্যমত পৌছে দেয় সাড়ে ৩ হাজারের বেশি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আর অস্বচ্ছল পরিবারে চাল, ডাল, তেল, লবন, আটাসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী।

মাত্র দু’দিন পর ঈদ। প্রতিবছর সীমান্তবর্তী বেশ কয়েকটি স্কুলের কোমলমতি শিশুদের মাঝে দেয়া হয় ঈদ উপহার হিসেবে ঈদের নতুন জামা। এ সংখ্যা দেখা যায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার পর্যন্ত। শিশুদের প্রিয় স্বর্গই যেন শিশুস্বর্গ। তাদের মুখে সবচেয়ে প্রিয় সমুচ্চারিত ডাক ‘কবীর আংকেল’। এ কবীর আংকেল হচ্ছেন শিশুস্বর্গের উদ্যোক্তা।

২০১০ সালে সীমান্ত পাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চালু করেন শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম। গড়ে তুলেন শিশুস্বর্গ পাঠাগার। প্রতিবছর ঈদের সময় ঈদবস্ত্র, শীতের মৌসুমে শীতবস্ত্র, শিক্ষাবৃত্তি চালুতে শিশুদের স্কুল গমনে যেমন তৈরি হয় প্রবল উৎসাহ, তেমনি ঝরে পড়া শিশুদের হাতে পৌছে বই, খাতা-কলম।

শিক্ষায় নতুন আলোয় বদলে যায় সীমান্তের কয়েকটি গ্রাম। প্রতি ঈদে শিশুরা নতুন জামা পেলেও এ বছর মহামারী করোনা দূর্যোগের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে শিশুদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে ঈদের খাদ্য সামগ্রী উপহার। এ উপহারে থাকছে শিশুদের প্রিয় পছন্দের খাবার প্যাকেট। শিশুস্বর্গের এ উপভোগ্য ঈদ উপহার পেয়ে ভুলে গেছে ঈদের নতুন জামার কথাও।

আরফিনা, শিমুল, কাকলী, নিজামসহ বেশ কিছু শিশুর সাথে কথা হলে তারা জানায়, কবীর আংকেল প্রতি ঈদে আমাদের নতুন জামা দেন। এ বছর করোনার কারণে ঈদের খাবার পেয়েছি। এটা কবীর আংকেলের গিফট, আনন্দই আলাদা। প্রিয় আংকেলকে অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ। এ ঈদ উপহার থেকে বাদ যায়নি অসহায়, অচ্ছল পরিবারগুলোও। তাদের ঘরেও পৌছে দেয়া হচ্ছে ঈদের উপহার হিসেবে ঈদ বাজার। এ উপহারের প্যাকে রয়েছে সেমাই, চিনি, পোলাও চাল, খাবার চাল, ডাল, লবন, তেল, দুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিশেষ ঈদ উপহার দেয়া হয়েছে মফস্বল সাংবাদিকদেরও।

শিশুস্বর্গের এ মহতি উদ্যোগ প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছে সীমান্তবর্তী এলাকার সচেতন নাগরিকদের কাছে। করোনা এ কঠিন পরিস্থিতিতে শিশুদের পাশাপাশি হয়ে অসহায় মানুষদের ঘরে খাদ্যসামগ্রী ও ঈদ বাজার পৌছে দিতে সত্যিকারের মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছে সর্বমহলে এরকম হাজারও প্রশংসা কুড়িয়েছে শিশুস্বর্গ।

শিশুস্বর্গের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক কবীর আকন্দ বলেন, বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতি করোনা প্রকোপে লকডাউনের পুরো সময়জুড়ে ইতিমধ্যে শিশুস্বর্গের ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আমরা ৩০৮৬ টি পরিবারকে খাদ্য সামগ্রী উপহার দিতে পেরেছি। সামনে ঈদুল ফিতর। আমরা প্রতি ঈদে সীমান্তের কোমলমতি শিশুদের ঈদের নতুন জামা উপহার দিয়ে থাকি। এ বছর মহামারী করোনা দূর্যোগ। তাই জাবিয়ানদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আমাদের প্রিয় শিশুদের ঈদের নতুন জামা না দিয়ে তাদের প্রিয় ঈদের খাবার উপহার দিচ্ছি।

এছাড়াও এ পরিস্থিতিতে আমাদের সাধ্যমত ৫শতাধিকেরও বেশি পরিবারের মাঝে ঈদ উপহার হিসেবে পৌছে দিব চাল, ডাল, তেল, আলু, সেমাই, দুধ ও চিনি সবকিছু মিলিয়ে ঈদ প্যাকেজ স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে পৌছে দিচ্ছি। চলবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত।

প্রসঙ্গত, দেশের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সাল হতে জন্মলগ্ন হতে অসহায় গরীব মেধাবী শিশুদের মাঝে শীতবস্ত্র, ঈদবস্ত্র, শিক্ষা উপকরণ, উপবৃত্তি বিতরণ করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩৪ জন হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। অনেকে অধ্যয়ন শেষ করে সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে।

এছাড়া এলাকার স্বল্প শিক্ষিত কিশোর-তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা করে আসছেন। বাদ যায়নি পিছিয়ে পড়া নারীরাও। তাদেরকেও প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত সমিতির মাধ্যমে নারীদের মাঝে গাভী দিয়ে আত্মনির্ভরশীল স্বাবলম্বী করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে শিশুদের উন্নত শিক্ষার জন্য শিশুস্বর্গ বিদ্যা নিকেতন নামের স্কুল চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে শিশু হাসপাতাল ও নির্মানেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্মাণ করা হচ্ছে শিশু আশ্রম।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।