মধ্যবিত্তের লকডাউন

প্রকাশিতঃ ৩:৫৩ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ৪ জুন ২০

আবুল কালাম আজাদ

মাহাবুব বিছানায় শুয়ে আছে চিৎ হয়ে। অপলকে চেয়ে আছে দুধ-সাদা ছাদটার দিকে। মাথার ভেতর ঘুর্ণি তুলেছে দুঃশ্চিন্তার সাইক্লোন।

মাহাবুব একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী। চাকরির বয়স ছয় বছর। সর্বসাকুল্যে বেতন আঠাশ হাজার টাকা। প্রভিডেন্ট ফান্ডে তিন হাজার টাকা জমা রেখে বেতন ড্র করে পঁচিশ হাজার টাকা। বারো হাজার টাকা বাসা ভাড়া দেবার পর হাতে থাকে তেরো হাজার টাকা।

স্ত্রী, দুইটি শিশু সন্তান আর বাবা-মাকে নিয়ে তার সংসার। তেরো হাজার টাকায় ঢাকা শহরে ছয় সদস্যের সংসার চলে না। ভাগ্য মাহাবুবের প্রতি সুপ্রসন্ন থাকায় সে একটা প্রাইভেট ফার্মে পার্টটাইম চাকরি যোগার করতে পেরেছিল। সপ্তাহে চারদিন বিকাল পাঁচটা থেকে রাত দর্শটা পর্যন্ত সে সেখানে কাজ করে। কম্পিউটার অপারেটিং এবং গ্রাফিক ডিজাইনের ওপর মাহাবুবের আছে অসাধারণ দক্ষতা। সেই সুবাদেই চাকরিটা পেয়েছে। বেতন তেরো হাজার টাকা। সপ্তাহে চার দিন কাজ করে মাসে তেরো হাজার টাকায় মাহাবুব অনেক খুশি। খুশির কারণে সে অনেক সময়ই রাত এগারো কি সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত কাজ করে।

চার দিন পার্টটাইম জবের পর হাতে থাকে আরও তিনদিন। এই তিন দিন মাহাবুব বসে থাকে না। দুইটা টিউশনি করে। তাতে পায় পাঁচ হাজার টাকা।

তেরো হাজার+পাঁচ হাজার=আঠারো হাজার। এই বাড়তি আঠারো হাজার টাকা মাহাবুবের বিরাট শক্তি। সেই শক্তির বলেই সে স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মাকে ঢাকায় নিজের কাছে রাখতে পেরেছে।

পাশের ফ্ল্যাটেই একটা রুমে সাবলেট থাকে মাহাবুবের সহকর্মী ও বুজম ফ্রেন্ড মিজান ও রঞ্জন। ওদের বাড়তি কোনো ইনকাম নেই। হাজার পঁচিশেক টাকাই ওদের সব। তাই ওরা স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মাকে নিজেদের কাছে রাখতে পারেনি। নিজেরা কষ্ট করে চলে যতটা সম্ভব বাড়িতে টাকা পাঠায়।

সাধারণ ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই মিজান আর রঞ্জন গ্রামে চলে গেছে। যেতে বাধ্য হয়েছে। এখানে বসে বসে খাওয়ার কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া লকডাউনের মধ্যে বাড়িতে টাকা পাঠানোটাও ঝামেলা। পরের মাসের বেতন কয় তারিখে হবে সেটাই বা কে জানে।

এখন মাহাবুবের মনে হচ্ছে মিজান আর রঞ্জনের মতো গ্রামে চলে গেলেই ভালো হতো। সে যে যায়নি তার মূল কারণ এই পার্টটাইম জবটা। মালিক আস্বস্ত করে বলেছিলেন: আপনার যা কাজ তা ঘরে বসে ল্যাপটপেই করতে পারবেন। আর কাজ যদি না থাকে তো আপনাকে না হয় এক/দুই মাসের বেতন এ্যাডভান্স দিয়ে দিবো। আপনি একজন দক্ষ কর্মী।

কিন্তু পরে মালিক কোনো কথাই রাখলেন না। বললেন: কোনো অর্ডার নেই। ঘরে বসে কী কাজ করবেন? মাস দুই রেস্টে থাকুন।

এ্যাডভান্স বেতন দিতেও অপারগতা দেখালেন। টিউশনি দুইটা বন্ধ। এখন উপায়? বাসা ভাড়া দেয়ার পর হাতে আছে তেরো হাজার টাকা। বৃদ্ধ বাবা-মা’র জন্য কিছু ওষুধ রাখতেই হয়। হাই ব্লাড প্রেসারের ওষুধ, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, ঠান্ডা-কাশির ওষুধ, ইনহেলার।

মাহাবুব শোয়া থেকে উঠল। ঘরের পাশে এক চিলতে বারান্দাটায় গিয়ে বসল। মিজান আর রঞ্জন থাকলে এখন ওদের সাথে গল্প করা যেত। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে পরিবারের সদস্যের মতোই ওরা। সোস্যাল ডিসট্যান্স রক্ষা করার ব্যাপার থাকতো না। নিশ্চয় ওরা এসময় সাহায্যের হাত বাড়াতো। বলতো, বাড়িতে না হয় কিছু টাকা কম পাঠালাম। ওরা ম্যানেজ করে নেবে। পুকুরে মাছ আছে, বাগানে সবজি আছে। তোকে কিছু দেই। এত ভালো বন্ধু আজকাল কম হয়।

নিচে নিম্নবিত্তের লোকদের নিরাপদ দুরত্বে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। ত্রাণ দিচ্ছেন এলাকার কমিশনার। মাহাবুব কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। তার মনে হলো, চুপি চুপি গিয়ে লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু না। সেটা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। দাঁত চেপে বসে থাকতে হবে, শুয়ে থাকতে হবে। তবে তার শেষ একটা ভরসা আছে। স্ত্রীর কিছু গহনা আছে। একান্তই পেরে না উঠলে……!

মাহাবুবের ফোন বেজে উঠল। রঞ্জন ফোন করেছে। মাহাবুবের ভেতর আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল। সাহায্য চাইলে ওরা ফেরাবে না। বিকাশ করে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেবে। রঞ্জন আর মিজান একই গ্রামে থাকে। পরস্পরের সাথে আলোচনা করে একটা ব্যবস্থা নেবেই।

মাহাবুব ফোন রিসিভ করল: হ্যালো। ওদিক থেকে কোনো সাড়া নেই। মাহাবুব আবার বলল: হ্যালো রঞ্জন……। এবার ওপার থেকে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ। মাহাবুব বলল: কী হয়েছে রঞ্জন?
: মিজান নেই!
: নেই!
: মিজান করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। আজ সকালে মারা গেছে।

মাহাবুব পাথর। পাথুরে মূর্তির চোখ বেয়ে নেমে এল অশ্রুর ধারা। বাঁধভাঙা অশ্রু। নিঃশব্দ কান্না।

কিন্তু শব্দটাকে বেশিক্ষণ ভেতরে আটকে রাখতে পারলো না। বাঁধ ভেঙে গেল। বুক ফেটে বেরিয়ে গেল। মাহাবুব ডুকরে কেঁদে উঠলো। ছুটে এল মাহাবুবের স্ত্রী, বাবা, মা। সবারই প্রশ্ন: কী হয়েছে? কী হয়েছে বলো?

মাহাবুব হাহাকার করে উঠে বলল: মিজান নেই!
: নেই! সম্মিলিত কন্ঠ।
: করোনায় আক্রান্ত হয়ে মিজান মরে গেছে। ও আর কোনোদিন আমার সাথে অফিস করবে না। ও আর কোনোদিন ফিরে আসবে না আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের ঘরটায়।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।