মানুষ আচরণে এখনো অমানুষ

প্রকাশিতঃ ৬:১৫ অপরাহ্ণ, বুধ, ৮ এপ্রিল ২০

সৈয়দ মহিউজ্জামান মুখর : একেকটি দিন এমনে এমনেই চলে যাচ্ছে। তারিখ কত, কি বার- এখন সেগুলো হিসেব করা দুরহ ব্যাপার। ঘরবন্দী মানুষগুলো অপেক্ষা করছে মুক্তির আশায়। কিন্তু ঘর থেকে বের হলেই যে মুক্তি, সেটা নয়। কি অদ্ভুত! ঘরের বাইরে যদি বেরও হয়, তাতেও নেই মুক্তি। অর্থাৎ মুক্ত হয়েও মুক্ত না। যতক্ষণ না করোনা নামের ওই বদমাশ ভাইরাসটা দূর হচ্ছে। তবে একতরফা দোষও কি এই ভাইরাসকে দেয়া যায়? আসলে ভাইরাসের সাথে আছে মূলত প্রকৃতির সংযোগ। কারণ ভাইরাস প্রকৃতিরই অংশ। প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজটি করলেই যে প্রকৃতি আগ্রাসী হয়ে ওঠে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজগুলোও যে করছে মানুষ, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। পশুপাখি, গাছপালা তো আর প্রকৃতিবিরোধী কাজ করে না। তাহলে! এই মহামারীর জন্য দায়ী কারা? উত্তর, ‘আমরাই’। কারণ, ভাইরাস তো তার প্রকৃতিগত আচরণটাই করে যাচ্ছে, কিন্তু ভাইরাসটির উৎসে আঘাত করার জন্য দায়ী কারা? ঘরে বসে বিষয়গুলো উপলব্ধি করার এখন এটাই সময়।

প্রাণীকুলের মধ্যে উন্নত হওয়ার পরেও মানুষ যে এখনো অনুন্নত কাজগুলোই করে চলছে, তা-ই শেখাচ্ছে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, জৈবিক গড়নে আমরা মানুষ হলেও, আচরণে এখনো অমানুষ। বিষয়টা উপলব্ধির।

আসলে, মানুষের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা প্রকৃতির সাথে ভারসাম্য করেই তৈরি। এর বিপরীত বা অতিরিক্ত কিছু করে প্রকৃতির ক্ষতি করলে মানুষেরই ক্ষতি। কারণ মানুষও তো প্রকৃতিরই অংশ। এখন করোনাভাইরাস যদি চীনা জাতির বাদূর খাওয়ার জন্য হয়ে থাকে, তাহলে এটা মানুষের প্রকৃতিপ্রদত্ত আচরণের বিপরীত, ভারসাম্যহীন এক অমানবিক খাদ্যাভ্যাস। অতিরিক্ত কোনো কিছুই প্রকৃতি সহ্য করতে পারে না। কে বলেছিলো চীনা জাতিকে, নিরীহ কুকুর, বিড়াল, বাদূরসহ অন্যান্য পশুপাখি খেতে? এগুলো প্রকৃতির ভারসাম্যকারী প্রাণী। প্রকৃতির সম্পদগুলো নষ্ট করে দিলে এর খেসারত মানবজাতিকে দিতেই হয়। আর যদি এই ভাইরাস মানুষ হত্যার জীবাণু মারণাস্ত্র তৈরির কোনো পরীক্ষার ফল, তাহলে এটি মানুষের বিবেকের অধপতনেরই কুফল।

যেটাই হোক, মানুষ আজ এই ভাইরাসটির কাছে অসহায়। হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। মৃত্যু ভয়ে আজ মানুষ গৃহবন্দী। কিন্তু কখনো কি আমরা উপলব্ধি করেছি, বন্দী জীবন কেমন হতে পারে? নিজেদের বিনোদনের জন্য মানুষ নিরীহ প্রাণীগুলোকে খাঁচায় ভরে তৈরি করলো চিড়িয়াখানা। আজ সেই পদ্ধতির জালে মানুষ নিজেই বন্দী। কেউ কি জানে, জাপানে প্রতি বছর পনেরো হাজারেরও বেশি নিরীহ ডলফিন হত্যা করা হয় মূলত সেগুলোর পাখনার স্যুপ তৈরি করার জন্য? জাপান, চীনসহ, ইউরোপ ও আরবদেশগুলোতে এগুলো ডেলিকেসি। কি নির্মম! অথচ আজ করোনা ভাইরাসের কারণে যে ইটালিতে প্রতিদিন শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে, সেই ইটালির ভেনিস শহরের খালগুলোতে ভেসে বেড়াচ্ছে ডলফিন। ভাসছে রাজহাঁস। ভারতের রাস্তায় বেরিয়ে আসছে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের দল। নদী-সমুদ্রের পানি এখন আগের থেকে স্বচ্ছ। বিশ্বব্যাপী কমে এসেছে বাতাসে দূষণের মাত্রা। শুধু মানুষগুলোই ঘরে বন্দী।

আশপাশে যখন মৃত্যুর ছড়াছড়ি, তখন বাইরে প্রকৃতি হাসছে। হাসুক প্রকৃতি, কিন্তু মানুষগুলো আপাতত ঘরেই থাকুক। এমনেও যান্ত্রিক জীবনে নিজের পরিবারকে কতটুকুই বা সময় দিতে পারে এযুগের মানুষ? তাই কোয়ারেন্টাইনকে বন্দীত্ব মনে না করে নিজের পরিবারের সাথে ‘কোয়ালিটি টাইম’ মনে করলেই হয়। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য যে আমাদের দেশে এমন মহামারীর মধ্যেও ঘরে থাকার জন্য কথা দিয়ে নয়, বরং পুলিশের লাঠির বাড়ি দিয়ে বোঝাতে হয়। অনেকেই এই পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নিচ্ছে। সরকার চেষ্টা করলেও সাধারণ মানুষ এর গুরুত্ব বুঝতেই পারছে না। বাইরে বের হয়েও বা কি উদ্ধার করছে এরা, কে জানে! এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যে জাতি লাঠির বাড়িতেও সচেতন হয় না, সেই জাতির কপালে যে কি অপেক্ষা করছে, তা বিধাতা ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না। এদিকে খাদ্য সংকট নেই বলা হলেও করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

আরেকদিকে কারখানাগুলোতে উৎপাদন না হলে হাতের টাকা মূল্যহীন হয়ে পড়বে। করোনা পরবর্তী চাপ সামলানোটাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। সামাজিকভাবে অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। কারণ, দিনে আনে দিনে খায় মানুষগুলো অসহায়। তারা সব হারিয়েছে। এতটা সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য অপরাধেও জড়িয়ে পড়তে পারে তারা। এদিকে ভ্যাক্সিন তৈরি সহসাই সম্ভব নয়, যদিও কাজ চলছে, তবে সময় লাগবে। আবার করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও, এটার কোনো নিশ্চয়তা নেই যে এটা আবার ছড়ানো শুরু করবে না। সর্তক সবসময় থাকতে হবে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময় কতটুকু সামলাতে পারবে মানুষ, বিশেষ করে আমাদের মতো ৩য় বিশ্বের দেশগুলো, সেটাও প্রশ্ন।

সবমিলিয়ে করোনা পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিকভাবেই সবগুলো দেশই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং হবেই। এটাই বাস্তবতা। এরপরেও, এমন পরিস্থিতিতে আমরা কি শিখলাম, কি উপলব্ধি করলাম, সেটাই ইতিবাচক দিক, যেটা করোনা পরিস্থিতি কেটে গেলে কাজে লাগানো যাবে। করোনার মহামারী যেনো বার্তা দিচ্ছে, মানুষকে মানুষ হতে। মানবিক হতে। বোঝাতে চাইছে, মানুষ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক নয়, বরং প্রকৃতিই মানুষের নিয়ন্ত্রক। এখন প্রশ্ন, এই মহামারী শেষে মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবে তো? নাকি আবারো শুরু করবে প্রকৃতির বিরুদ্ধে অতীতের মতো তার দানবীয় খেলা? যা প্রকৃতিকে আবারো বাধ্য করবে নতুন কোনো মহামারী নিয়ে হাজির হতে? যেটাই হোক, আপাতত সবাই ভালো থাকুক, নিরাপদ থাকুক, মৃত্যুর দুয়ার বন্ধ হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসুক প্রাণচাঞ্চল্য, এটুকুই চাওয়া।

লেখকঃনিউজ প্রেজেন্টার, এশিয়ান টিভি এবং প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, আভান্তে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ