যেসব কারণে দরকার ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খাবেন না

প্রকাশিতঃ ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গল, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০

ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস জিনাত :

প্রথমেই গ্যাস্ট্রিক শব্দটা সম্পর্কে কনফিউশান দূর করি। গ্যাস্ট্রিক( gastric) বলতে মূলত stomach বা পাকস্থলী বুঝায়। আমাদের Hyperacidity বা gastritis বা gastric ulcer হলে আমরা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে বলে থাকি।

কিন্তু আমাদের একটা প্রবণতা আছে, কিছু থেকে কিছু হলেই গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খাই। এই অভ্যাস অবশ্যই আমাদের বর্জন করতে হবে। কারণগুলি আলোচনা করলেই আমরা বুঝতে পারব কেন আমরা কারণে অকারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যাতীত গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খাবনা।

পাকস্থলীতে আল্লাহ ন্যাচারালি একটা এসিড দিয়েছেন, যেটা পাকস্থলীর সেলগুলি থেকেই তৈরি হয়- এর নাম হাইড্রোক্লোরিক এসিড (HCl)। এটি বেশ স্ট্রং একটি এসিড এবং চামড়ায় লাগলে চামড়া পুড়ে যাবে। কিন্তু পাকস্থলীর ভেতরে এমনভাবে একটা প্রটেকটিভ লেয়ার আছে, যার জন্য সেটা পুড়ে যায়না। কিন্তু এই এসিডের দরকার কি?

প্রথমতঃ এসিডটি পাকস্থলীর পরিবেশটাকে এসিডিক করে রাখে, মানে pH খুবই কম থাকে; যেটা প্রোটিন জাতীয় খাবারের হজমের জন্য মাস্ট। তার মানে এই এসিডিক পরিবেশ না থাকলে প্রোটিন হজম হবেনা।

দ্বিতীয়তঃ আমরা রাস্তার খাবার ও নানা আজেবাজে জিনিস খাই। একই খাবার খেয়ে আপনার হয়তো পেট খারাপ হল, কিন্তু আপনার বন্ধু দিব্যি ভাল আছে। কেন? কারণ খাবারের সাথে নানারকম জীবাণু আপনাদের শরীরে ঢুকছে। কিন্তু আপনার বন্ধুর পেটের এসিডিক পরিবেশের কারণে জীবাণুগুলি ধ্বংস হয়ে গেছে, তাই তার কিছু হয়নি। কিন্তু আপনি গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খেয়ে আপনার এসিডের বারটা বাজিয়েছেন। তাই জীবাণুগুলি না মরে আপনার পেট খারাপ করে ফেলেছে।

তৃতীয়তঃ এই এসিডটি আয়রন শোষণের(absorption) জন্য বাধ্যতামূলক। আয়রণ ট্যাবলেট যতই খান,বা যতই কচু শাক, কলা ইত্যাদি খান- সেটা শরীরে শোষণ হবেনা, বের হয়ে যাবে। ফলে আপনি রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়াতে ভুগবেন। এটি ক্যালসিয়াম শোষণেও সাহায্য করে।

চতুর্থতঃ এটি হজমের জন্য দরকারী অন্যান্য আরও কিছু এনজাইমের secretion এ সাহায্য করে।

গ্যাস্ট্রিকের ঔষধগুলি মূলত যেই এসিডটি ইতিমধ্যে বের হয়েছে তাকে নিউট্রিলাইজ করে(antacid) বা এসিডটিকে বের হতে বাধা দেয় বা তৈরী হতে দেয়না (omeprazole,ranitidine ইত্যাদি)।

তার মানে সামান্য কারণে ঔষধ খেলে আপনি খাবারের সাথে জীবাণুকে শরীরে ঢুকতে দিচ্ছেন, প্রোটিনকে ঠিকমতো হজম হতে দিচ্ছেন না ফলে সেটা আপনার শরীরের কোনো কাজে লাগছেনা, আয়রন আর ক্যালসিয়ামকে শোষণ (absorption) এ বাধা দিচ্ছেন এবং হজমে সহায়ক অন্যান্য এনজাইমগুলিকেও ঠিকমতো বের হতে দিচ্ছেন না।

ফলে আপনার শরীর দূর্বল হয়ে পড়বে, অল্পতেই অসুস্থ হয়ে যাবেন, রক্তাল্পতা দেখা দিবে, শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিবে – আরও নানান সমস্যা হবে।

আমি বেশ কয়েকজন রোগীকে দেখেছি, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিন গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খাওয়ার ফলে অন্য তেমন কোনো রোগ না থাকার পরেও তাদের হিমোগ্লোবিন ৮ এ নেমে এসেছে।

তবে যারা অনেকদিন ধরে নিয়মিত গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খেয়ে আসছেন, তারা এটা হুট করে বন্ধ করবেন না। তাহলে বেশি সমস্যা হবে এসিডিটির। ধীরে ধীরে কমাতে হবে, তাহলে ইন-শা-আল্লাহ সমস্যা কম হবে।

গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ এড়াতে করণীয়ঃ

১) সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন

২) রোজা রাখা ছাড়া পেট বেশিক্ষণ খালি রাখবেন না, দুই-তিন ঘন্টা পরপর একটি বিস্কুট বা একমুঠ মুড়ি হলেও খান।

৩) প্রচুর পানি খান

৪) নিয়মিত ব্যায়াম করুন বা হাঁটুন।

৫) খাওয়ার পর সাথে সাথে শুবেন না। খাওয়ার কমপক্ষে ২ ঘন্টা পরে শুবেন।

৬) সকালে ভারী খাবার খাবেন এবং রাতের খাওয়া ৭-৮ টার মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করবেন। এরপরে ফল বা সালাদ খান।

৭) একবারে অতিরিক্ত খাবার না খাওয়ার চেষ্টা করবেন, পেট কিছুটা খালি রেখে খাওয়ার চেষ্টা করবেন।

৮) ধুমপান, পান-জর্দার অভ্যাস থাকলে বাদ দিন।

৯) অতিরিক্ত ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।

১০) অতিরিক্ত চা-কফি খাবেন না। দিনে সর্বোচ্চ ২ কাপ।

১১) লবণ, তেল জাতীয় খাবার কম খান।

উপরে উল্লেখিত নিয়মগুলো কেউ সঠিকভাবে পালন করতে পারলে তার গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খাওয়ার দরকার প্রায় পড়বেই না। সাথে সাথে প্রেশার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের সম্ভাবনাও একেবারেই কমে যাবে। তাই সব জানার পর আপনিই সিদ্ধান্ত নিবেন পরবর্তী দিনগুলোতে আপনি কেমন থাকতে চান।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ