যে কারণে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতারের সুনাম

প্রকাশিতঃ ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ, বৃহঃ, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০

ইলিয়াস হোসেন :

প্রসূতির মৃত্যু এখনও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বড় একটি সমস্যা। আর এই মৃত্যুর প্রধান একটি কারণ রক্তক্ষরণ।

আজ থেকে ২০ বছর আগে অত্যন্ত অল্প খরচে সহজ একটি পদ্ধতিতে প্রসূতির রক্তক্ষরণ বন্ধের উপায় বাতলে দিয়েছিলেন গাইনির ওপর বাংলাদেশের প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. সায়েবা আখতার।

ক্যাথেটার দিয়ে একটি কনডম প্রসূতির জরায়ুর ভেতর ঢুকিয়ে তা বাতাস দিয়ে ফুলিয়ে রক্ত বন্ধ করতে তাঁর আবিষ্কৃত এই পদ্ধতি এখন বিশ্বের বহু দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে।

সারা বিশ্বে প্রতি দুই মিনিটে একজন করে প্রসূতি মায়ের মৃত্যু ঘটছে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। এর ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ। এই চিরাচরিত ভয়ঙ্কর চিত্রটি বদলে দিতে বিস্ময়কর অবদান রাখেন বাংলাদেশের চিকিৎসক ডা. সায়েবা আখতার।

‘সায়েবাস মেথড’ নামের এই পদ্ধতি আজ অজস্র নারীর জীবন বাঁচানোর এক মোক্ষম উপায় হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও আফ্রিকা মহাদেশ ও দক্ষিণ আমেরিকার এক ডজন দেশে সরকারি কর্মসূচির অংশ হয়ে উঠেছে এই পদ্ধতি। নেপাল ও পূর্ব তিমুরেও এটা ব্যবহৃত হচ্ছে।

তারই স্বীকৃতিস্বরূপ এবছর বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক পেতে যাচ্ছেন কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. সায়েবা আখতার। নিরাময়২৪ পরিবারের পক্ষ থেকে ‘সায়েবাস মেথড’ এর জননীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

৫ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২০২০ সালের একুশে পদকপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করে। ডা. সায়েবা আক্তার ছাড়াও আরও ১৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করার পর সেখানেই প্রথম চাকরি। তারপর আইপিজিএমআর, বরিশাল মেডিকেল, ময়মনসিংহ মেডিকেল, সিলেট মেডিকেল এবং সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেলে যোগ দিয়েছেন ডা. সায়েবা আখতার। সময় ও স্থান বদলালেও মাতৃমৃত্যুর যে চিত্র তা বদলায়নি। বরং ঢাকা মেডিকেলে রোগীর চাপ বেশি থাকায় মাতৃমৃত্যুও তাকে বেশি দেখতে হয়েছে। চোখের সামনে হাজারো মায়ের প্রাণ হারানোর দৃশ্য অন্যান্য হাসপাতালের চেয়ে বেশি ছিল। বেশ কিছু বছর আগে শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই চিত্র ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল প্রসব পরবর্তী রক্তপাত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় পোস্ট পারটাম হেমোরেজ বা পিপিএইচ। এর চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল বেশ ব্যয়বহুল। বাংলাদেশসহ অন্যান্য অনুন্নত দেশের জনগণের জন্য এই ব্যয় বহন করা ছিল কষ্টকর। কখনো কখনো মাকে বাঁচাতে গিয়ে জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হতো। সেক্ষেত্রে ওই নারী চিরদিনের জন্য মা হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো।

২০০০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতারকে খুব ভাবিয়েছিল। একবার এক ট্রেনিং প্রোগ্রামে প্রসূতি মায়ের রক্তক্ষরণ বন্ধে একটি টেম্পোনেডের ব্যবহার দেখেছিলেন তিনি। সেটা ফুলানো কনডমের মতোই। মাত্র একবারই ব্যবহার করা যেত এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় ওই পদ্ধতি দেশে চালু হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ডা. সায়েবা বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। হঠাৎ মনে হলো কনডম তো একটি এফডিএ অনুমোদিত মেডিকেল ডিভাইস। এটা জরায়ুর ভিতরে ঢুকিয়ে যদি কোনোভাবে ফোলানো যায় তাহলে জরায়ুর দেয়ালে সহজেই চাপ সৃষ্টি করবে। সে চাপে হয়তো রক্তপাত বন্ধ হবে। তাছাড়া আমাদের হাত-পা কেটে গেলেও শক্ত করে চাপ দিয়ে ধরলে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। জরায়ুর ভিতরে বিশেষ ধরনের ওই টেম্পোনেডই কেন লাগবে, কনডম দিয়ে চাপ দিলেও রক্তপাত বন্ধ হতে বাধ্য। যেই ভাবা সেই কাজ, ডা. সায়েবা কনডমের ভিতরে পানি ঢুকিয়ে এর স্থিতিস্থাপকতা পরীক্ষা করলেন। দেখলেন মোটামুটি এক লিটার পানির চাপেও কনডমটি ফেটে যাচ্ছে না।

পরের দিন সকালে অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে দেখেন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য এক নারীর জরায়ু কেটে ফেলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তখন তিনি অপারেশনের বাধা দিয়ে প্রথমবারের মতো কনডম টেম্পোনেড ব্যবহার করলেন। একটি ক্যাথেটারের মাথায় একটি কনডম বেঁধে জরায়ুতে ঢুকিয়ে দেন। তারপর ক্যাথেটার দিয়ে স্যালাইন পুশ করে জরায়ুর মধ্যে কনডমটি ফুলিয়ে তোলা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে ১৫ মিনিটের মধ্যেই রক্তপাত বন্ধ হয়েছিল। রোগীটি তার জরায়ুসহ সুস্থভাবে বাড়ি ফিরেছিল। এই পদ্ধতি রক্তক্ষরণ বন্ধে যেমন কার্যকর, তেমনি খরচ খুবই নগণ্য।

প্রথম সফলতা পাওয়ার পর শুরু হলো তার গবেষণা। সমসাময়িক কয়েকজন টিম মেম্বার নিয়ে কাজ শুরু করলেন। ২০০১-২০০২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. সায়েবা আখতারের নেতৃত্বে ২৩ জন রোগীকে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের প্রত্যেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেন। তার এই আবিষ্কার ও গবেষণা ২০০৩ সালে গবেষণা কর্মটি মেডস্কেপ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে এটি অরিজিনাল রিসার্চ পেপার হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব গাইনি অ্যান্ড অবসসহ আরও বেশকিছু জার্নালে প্রকাশ পায়। বিশ্বজুড়ে এটি সায়েবা’স মেথড হিসেবে পরিচিতি পায়। আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে জানার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার ডাক পড়ে সায়েবা’স মেথড এর ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এই মেথড নিয়ে এফসিপিএস ডিজার্টেশন, এমএস থিসিস, পিএইচডি থিসিস হয়েছে। তাকে রয়্যাল কলেজ অব অবস অ্যান্ড গাইনোকলজিস্ট থেকে অনারারি ফেলোশিপও দেওয়া হয়েছে।

প্রথমে যখন মেথডটি আবিষ্কার হয় তখন ডা. সায়েবা এটাকে ‘মেলস কনডম ইন উইমেনস হেলথ’ শিরোনামে উপস্থাপন করেন। কিন্তু পাবলিকেশনের সময় এটাকে সায়েবাস মেথড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। টিমের অন্যান্যদের সহায়তা থাকলেও মূল ভাবনা ছিল ডা. সায়েবার। তাছাড়া বিশ্বের জার্নালগুলো এই পদ্ধতিতে সায়েবাস মেথড নামেই পরিচিতি দিয়েছে।

চাকরি থেকে অবসরের পর রাজধানীর মগবাজারে ‘মামস ইন্সটিটিউট অব ফিস্টুলা অ্যান্ড ওমেনস হেলথ’ নামের একটি চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গরিব দুস্থ ফিস্টুলা রোগীদের এখানে তিনি পরম মমতায় চিকিৎসা করেন।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ