শাহজালালে এক যাত্রীর লাগেজ নিয়ে যাচ্ছেন আরেক যাত্রী!

প্রকাশিতঃ ২:৪২ অপরাহ্ণ, শুক্র, ৬ সেপ্টেম্বর ১৯

২৭ জুলাই ভোর রাতে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে বেলিজিয়াম থেকে ঢাকায় আসেন জাবের উদ্দিন ও তার স্ত্রী জয়িতা। তাদের সঙ্গে একটি কার্টনে ছিল ৪০ হাজার (৩৭ লাখ ৮৮ হাজার টাকা) ইউরো। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেল্টে দাঁড়িয়ে ব্যাগের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সব ব্যাগ আসলেও আসেনি ইউরো ভর্তি কার্টনটি। অভিযোগ জানালেন কাতার এয়ারওয়েজের কাছে, রিপোর্ট করলেন বিমানবন্দরের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে। কয়েকদিন পার হলেও কার্টনের হদিস পাননি জাবের দম্পতি। পরে অভিযোগ করেন বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের কাছে। এরপর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ আবিষ্কার করে আরেক ফ্লাইটের যাত্রী কার্টনটি নিয়ে চলে গেছেন। খোঁজ‍ নিয়ে জানা গেলো, ওই যাত্রী কার্টন নিয়ে বাক্ষ্মণবাড়িয়ায় চলে গেছেন। প্রথমে ওই যাত্রী কার্টন নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরে ইউরো ভর্তি কার্টন উদ্ধার করে ৮ আগস্ট জাবের-জয়িতা দম্পতির কাছে ফেরত দেয় পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে জাবের বলেন, ‘বিমানবন্দরে লাগেজ কাটার ঘটনা ঘটে এটা শুনেছিলাম। কিন্তু এভাবে ব্যাগ গায়েব হয়ে যাবে ভাবিনি। প্রথমে ভেবেছিলাম বিমানবন্দর বা এয়ারলাইনসের কেউ চুরি করেছে, কিন্তু অন্য যাত্রী নিয়ে যাবে এটা ভাবিনি।’

শুধু জাবের দম্পতি না, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা, চুরি নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার ও নজরদারি বেড়েছে। এরপরও লাগেজ চুরি হচ্ছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভুলবশত অনেক যাত্রী আরেকজনের লাগেজ নিয়ে যাচ্ছেন। অনিচ্ছাকৃত ভুলের পাশাপাশি চুরির ঘটনাও ঘটছে। লাগেজ না পেয়ে প্রথমে বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনস কর্মীদের দিকেই অভিযোগ যাত্রীদের। এপ্রিল থেকে আগস্টে কমপক্ষে ১১ যাত্রীর কাছ থেকে অন্য যাত্রীর লাগেজ উদ্ধার করেছে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একই রকম লাগেজ হওয়ায় অনেক যাত্রী ট্যাগ চেক না করে অন্য যাত্রীর ল্যাগেজ নিয়ে চলে যায়। এসব ক্ষেত্রে ভোগান্তি হলেও যাত্রীরা লাগেজ ফেরত পান। কখনও কখনও ভুলে বিমানবন্দরে ব্যাগ ফেলে যান যাত্রীরা। তবে অনেক যাত্রী লাগেজ বেল্ট থেকে অন্য যাত্রী লাগেজ চুরি করে নিয়ে যান। এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত ১৪২ জনকে লাগেজ ফেরত দিয়েছে আর্মড পুলিশ।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি ৩৯টি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এসব এয়ারলাইন্সের দিনে গড়ে ২৫০টি ফ্লাইট উঠা-নামা করে। এর মধ্যে ১৩০টি আান্তর্জাতিক ফ্লাইট উঠা-নামা করছে। যাত্রীদের লাগেজ দ্রুত পেতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে বাড়ানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। বিমানবন্দরের কর্মরত কর্মী, ল্যাগেজ হ্যান্ডেলিং কর্মীদের ওপর বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। বিমান থেকে নামার পর তাদের দেহ তল্লাশি করা হয়। এরপরও কারও যাত্রী হয়রানি, চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ধরা পড়লেই চাকুরিচ্যুত করাসহ নেওয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন্স অ্যান্ড মিডিয়া) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বিমানবন্দরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। ভুলে ফেলে যাওয়া বা হারানো হোক ব্যাগ যাত্রীর কাছে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখে শনাক্ত করেছি এক যাত্রী অন্য যাত্রীর ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কেউ ভুলে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে। এরকম ঘটনায় যাত্রীদের অভিযোগ পেলে আমরা লাগেজ উদ্ধার করে দিচ্ছি। কেউ কেউ ভুলে বিমানবন্দরে ব্যাগ ফেলে যান। সেগুলোও সংরক্ষণ করা হয়, তারপর যাত্রীকে ফেরত দেওয়া হয়।’

বর্তমানে কোনও যাত্রীর লাগেজ হারালে এয়ারলাইনসকে প্রতি কিলোগ্রামের জন্য ২০ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়া আকশপথে পরিবহন আইন অনুযায়ী লাগেজ হারালে এয়ারলাইনসকে দিতে হবে ১৪০৭ ডলার। ফলে লাগেজ চুরির ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে এয়ারলাইনসগুলোর।

রিজেন্ট এয়ারওয়েজের সহকারী মহাব্যবস্থাপক কেএম জাফরুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্বের সব বিমানবন্দরে যাত্রীরা ট্যাগ মিলিয়ে নিজেদের ব্যাগ লাগেজ বেল্ট থেকে সংগ্রহ করেন। কিন্তু আমাদের বিমানবন্দরে অনেক যাত্রী ট্যাগ চেক করেন না। ফলে অনেকেই একই রকম দেখতে আরেক যাত্রীদের ব্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছেন। আবার কোনও কোনও যাত্রী আরেক যাত্রীর ব্যাগ চুরি করছে। যাত্রীরা শুরুতে ভাবেন নতুন বিমানবন্দরের কেউ চুরি করছে।’

কেএম জাফরুজ্জামান বলেন, ‘নতুন আইনে জরিমানার হার বেড়েছে। এ কারণে এখন আমাদের সব যাত্রীকে চেক করতে হচ্ছে। এ কাজের জন্য জনবল বাড়াতে হয়েছে। আবার চেক করার কারণে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিও হচ্ছে। কিন্তু কে চুরি করছে, কে ভুল করে অন্য যাত্রীর ব্যাগ নিচ্ছে— এটা নিশ্চিত হয়ে ব্যাগ হস্তান্তর করা ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায়ও নেই।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, গত তিনমাসে বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ কাটা হয়েছে এমন অভিযোগ আসেনি। বিমানবন্দরের সর্বত্র সিসি ক্যামেরা আছে। এগুলো ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং হয়। ফলে কেউ চুরি করলে ধরা পড়বে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক বলেন, ‘যাত্রীরে দ্রুত সময়ের মধ্যে এখন লাগেজ পাচ্ছেন। চুরির ঘটনা দুই একটা ঘটছে না, তা নয়। যারা চুরি করছে তারা জানে না যে প্রত্যেক জায়গায় আমাদের সিসি ক্যামেরা আছে। একমাত্র বিমান থেকে ব্যাগ নামানোর জায়গায় সিসি ক্যামেরা নেই। তবে বিমান থেকে নামার পর তাদের তল্লাশি করা হয়, একইসঙ্গে তাদের পকেট বিহীন পোশাক দেওয়া হবে। আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। লাগেজ কাটা, চুরি করে পার পেয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।’

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ