সমাজ বিধ্বংসী পরকীয়াঃ কারণ ও প্রতিকার

প্রকাশিতঃ ৫:৪৬ অপরাহ্ণ, শুক্র, ৬ ডিসেম্বর ১৯

এম. শামছুল আলম: ‘পরকীয়া’ শব্দটি মনের মধ্যে এক ভিন্ন অনুভূতির সঞ্চার করে। সে অনুভূতি কখনো মধুর কখনো ঘৃণার কিংবা কখনো আফসোসের। বর্তমান বিশ্বে এমনকি আমাদের দেশেও একটি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে এটি। ইংরেজি Adultery বা Extramarital sex শব্দদ্বয়ের বাংলা প্রতিশব্দ ‘পরকীয়া’। পারিভাষিক অর্থে পরকীয়া বলতে, বিবাহিত কোন ব্যক্তির (নারী বা পুরুষ) স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তির সাথে বিবাহোত্তর বা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্ক ও যৌন কর্মকাণ্ডকে বুঝায়।

encyclopedia britannica পরকীয়া’র সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এইভাবে, Adultery: sexual relations between a married person and someone other than the spouse. মানবসমাজে পরকীয়া শব্দটি লঘু বা গুরুভাবে নেতিবাচক হিসেবে গণ্য। এটি সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণগুলোর একটি। এটি একটি পরিবার তথা সমাজ জীবনে নিয়ে অশান্তির কালো ছায়া।

পাশ্চাত্য আধুনিক সমাজে এর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বজায় থাকলেও এটি আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরকীয়াকারী ব্যক্তির বিবাহিত সঙ্গী তার সাথে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য কোর্টে আবেদন করতে পারেন। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মে এটিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করলেও ইসলাম ধর্মে এর সর্বোচ্চ শান্তি নির্ধারণ করা হয়েছে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা।

বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির সয়লাম, ইন্টারনেটর সহজলভ্যতা ও পশ্চিমা সংস্কৃতির নগ্ন থাবা আমাদের সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে অনৈতিকতার বিষবাষ্প। যার ফলে মহানগর থেকে মফস্বল সবখানেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ ও পরকীয়ার মতো জগণ্যতম অপরাধগুলো। পরকীয়া প্রেমের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা পরিবার ভাঙণ আমাদের সমাজে হর-হামেশাই দেখা যায়। বিবাহ বিচ্ছেদে স্বামী বা স্ত্রীর জীবনে তেমন কোন ক্ষতিকর প্রভাব না পড়লেও তাদের সন্তানদের জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ যন্ত্রণা। পিতা-মাতা কারো কাছে ঠাঁই না পেয়ে একসময় তারা নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যা একটি পরিবারের জন্য যতোটা না ক্ষতিকর তারচেয়ে বহুগুণে ক্ষতিকর সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের জন্য। কিন্তু কেন এই পরকীয়া? কী বা তার কারণ এবং এর প্রতিকারই বা কী? সেই সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো বাহ্মমাণ প্রবন্ধে।

পরকীয়ার কারণঃ সমাজ বিধ্বংসী পরকীয়ার জন্য প্রধানত আমরা নিজেরাই দায়ী। আমাদের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সয়লাব হচ্ছে পরকীয়ার মতো জঘন্য অপরাধগুলো। আসুন জেনে নিই পরকীয়ার কারণগুলো কী কী? পরকীয়ার সহায়ক হিসেবে আমরা নিন্মোক্ত কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারিঃ
১। অল্প বয়সে বিয়েঃ অল্প বয়সে ছেলে কিংবা মেয়ে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজে খুব বেশি পরিলক্ষিত হয়। অথচ এই বয়সে তারা খুব বেশি আবেগ-প্রবণ হয়ে থাকে। কিন্তু খুব অল্প বয়সে অভিভাবক হয়ে যাওয়ার ফলে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে সময় দিতে পারে না। ফলে অনেক সময় যে কোন একজন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।

২। অপূর্ণ প্রত্যাশাঃ যৌনতা মানুষের শারীরবৃত্তীয় চাহিদা। প্রত্যেক পুরুষ বা মহিলা তার সঙ্গীর কাছ থেকে সর্বোত্তম শারীরিক সুখ প্রত্যাশা করে। কিন্তু যখনই স্বামী-স্ত্রীর যৌন জীবনে ঘাটতি দেখা দেয় তখনই তৃতীয় ব্যক্তির প্রতি আসক্তি তৈরি হয়।
৩। আকর্ষণ নষ্ট হওয়াঃ আধুনিক যুগে প্রেম-ভালোবাসা তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। পূর্ব প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকেরা যে ভালোবাসা নিয়ে সাহিত্য রচনা করতো তা ছিল কুলষতামুক্ত ও পবিত্র। কিন্তু বর্তমান সময়ে ভালোবাসা বলতে শারীরিক সম্পর্ককে বোঝায়। বিয়ের পূর্বে যদি স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত থাকে তবে বিয়ের পর পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ অনেক ক্ষেত্রেই কমে যায়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪। দুরত্বঃ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দুরত্ব পরকীয়ায় বড় একটি সহায়ক শক্তি। স্বামী যখন তার স্ত্রী থেকে দূরে কর্মস্থলে কিংবা প্রবাসে অবস্থান করে তখন তাদের কেউ একজন অথবা দুজনেই সঙ্গীর অভাবে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।

৫। স্বভাবঃ প্রবাদে আছে, “ব্যাঙ দাঁড়িপাল্লায় রেখে ওজন কর সম্ভব কিন্তু মানব স্বভাব কখনোই পরিবর্তন সম্ভব নয়”। কিছু নারী-পুরুষ স্বভাবতই অনেক জনের সাথে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। তাই এরা বিয়ের পরেও অপর কারুর সাথে সম্পর্কে লিপ্ত থাকতে চায়।

৬। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাঃ একসময় কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়তো, এর বাইরে বড়জোর পাশের বাড়ির কেউ সর্বোচ্চ অফিসের সহকর্মী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এর সীমারেখা। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে পরকীয়ায় জড়ানোর জন্য ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটর, ইমু, হোয়াটস অ্যাপ, ভাইবভার ইত্যাদির মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা যায় খুব সহজেই। তাছাড়া ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির মতো অশ্লীল ভিডিও দেখে মানুষ নিজের সঙ্গীকে ঐভাবে কল্পনা করতে থাকে; কিন্তু বাস্তবতা যখন এর ধারে-কাছেও থাকে না, তখনই মানুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।

৭। পশ্চিমা সংস্কৃতির সয়লাবঃ আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমাদের সমাজে অশ্লীলতা-বেহায়াপনার সয়লাবে অন্যতম সহায়ক। তাদের সমাজে এগুলো অপরাধই মনে করা হয় না। পশ্চিম সংস্কৃতির আমদানি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির জন্য হুমকি স্বরূপ। তাদের সংস্কৃতি আমদানির ফলেই পরকীয়ার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজে সহজেই বিস্তার লাভ করতে পারে।

প্রতিকারঃ এই ধরনের সামাজিক অবক্ষয় থেকে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের নিন্মোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিতঃ
১। সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়াঃ সন্তানদেরকে যদি শিশুকাল থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা না হয় তবে তারা যেকোনো অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেছেন, “নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষের চরিত্র বলতে কিছুই থাকে না”। তাই বাল্যকাল থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা পিতামাতার কর্তব্য।

২। দেশীয় সংস্কৃতির প্রসারঃ বাঙালি জানি একটি ঐতিহ্যবাহী জাতি; এটি স্মরণাতীতকাল থেকে নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে স্বমহিমায় ভাস্বর। এই দেশ এবং সমাজকে অনৈতিকতার ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে হলে সমাজের সর্বস্তরে দেশীয় সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হবে।

৩। ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণঃ ইন্টারনেটের অতিরিক্ত সয়লাবই অশোভন কার্যকালাপের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। তাই ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণে আনাও রাষ্ট্রের কর্তব্য।

৪। শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা গ্রহণঃ শারীরিক সামর্থ্যহীনতার ফলেই অধিকাংশ পরকীয়া সংঘটিত হয়ে থাকে। তাই শারীরিক সমস্যার যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। দেশে এখন বিভিন্ন জায়গায় সেক্স থেরাপি হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেক্স ক্লিনিক চালু হয়েছে। সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করে দাম্পত্য জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

পরকীয়ার মতো অবক্ষয় আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার কারণে দাম্পত্য কলহ, সংসার ভাঙণ, আত্মহত্যা, খুন, শিশু হত্যার মতো অপরাধগুলো পাল্টা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। যা একটি জাতির জন্য অশনি সংকেত সদৃশ। সমাজ বিধ্বংসী এই বিষয়গুলোকে কঠোর আইনের মাধ্যমে দমন করা রাষ্ট্রের যেমন কর্তব্য, এসব থেকে সতর্ক থাকাও নাগরিকদের কর্তব্য। তবে গড়ে উঠবে সভ্য ও সমৃদ্ধ জাতি।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ